ঢাকা, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
১২ কার্তিক, ১৪৩৩

/ Breaking News

জলের আয়নায় সবুজ বন, রাতারগুলে একদিন

শফিকুল ইসলাম

প্রকাশিত: ১১:৪১, ৭ অক্টোবর ২০২৬

জলের আয়নায় সবুজ বন, রাতারগুলে একদিন

কল্পনায় কখনো কখনো এমন কিছু দৃশ্য আঁকা হয়, বাস্তবে যার সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু সিলেটের রাতারগুল জলাবনে গিয়ে মনে হলো, প্রকৃতি কল্পনাকেও হার মানাতে পারে।

চারদিকে পানি। সেই পানির বুক চিরে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছে ছোট্ট নৌকা। দুই পাশে সারি সারি গাছের কাণ্ড পানির ভেতর দাঁড়িয়ে। মাথার ওপর সবুজ পাতার ছাউনি। কোথাও রোদের ঝিলিক, কোথাও ঘন ছায়া। মাঝির বৈঠার টুপটাপ শব্দের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে পাখির ডাক আর পানির মৃদু ঢেউ।

এ যেন কোনো সিনেমার দৃশ্য নয়—সিলেটের গোয়াইনঘাটের রাতারগুল।

শহর থেকে জলাবনের পথে

রাতারগুল দেখতে হলে প্রথমে যেতে হবে সিলেটে। সিলেট শহর থেকে গোয়াইনঘাট হয়ে জলাবনের প্রবেশপথে পৌঁছানো যায়। বিভিন্ন তথ্যসূত্রে শহর থেকে দূরত্ব প্রায় ২৬ থেকে ৩০ কিলোমিটারের মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

সড়কপথের একপর্যায়ে শহরের কোলাহল পেছনে পড়ে যায়। সামনে খুলে যায় গ্রামীণ জনপদ। সরু রাস্তার দুই পাশে সবুজ, কোথাও ছোট নদী বা খাল, কোথাও ঘরের আঙিনায় গাছপালা। যত এগোনো যায়, ততই বদলে যায় চারপাশের পরিবেশ।

এরপর আসে নৌঘাট। এখান থেকেই শুরু হয় রাতারগুলের আসল গল্প।

নৌকায় উঠতেই মনে হয়, এতক্ষণ যে পথে এসেছি সেটি ছিল শুধু প্রস্তুতি। মূল ভ্রমণ যেন এখনই শুরু।

পানির নিচে দাঁড়িয়ে থাকা বন


রাতারগুল বাংলাদেশের অন্যতম অনন্য মিঠাপানির জলাবন। এটি গোয়াইন নদীর সঙ্গে চেঙ্গির খালের মাধ্যমে যুক্ত। বর্ষাকালে উজানের পানি ও বৃষ্টির পানিতে জলাবনের বড় অংশ ডুবে যায়। তখন গাছের কাণ্ডের বেশির ভাগ অংশ পানির নিচে থাকে, আর পানির ওপর দেখা যায় সবুজ ডালপালা ও পাতার বিস্তার।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রাতারগুল জলাবনের মোট জলাভূমি এলাকার পরিমাণ ৩ হাজার ৩২৫ একরের বেশি; এর মধ্যে ৫০৪ একরকে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

নৌকা যখন সরু জলপথ ধরে এগোয়, তখন দুই পাশের গাছগুলো এত কাছে মনে হয় যে হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে ফেলা যাবে। পানিতে গাছের ছায়া পড়ে তৈরি হয় আরেকটি বন—একটি পানির ওপরে, আরেকটি পানির আয়নায়।

হিজল, করচ, বরুণ, কদম, অর্জুন, বেতসহ নানা জলসহিষ্ণু উদ্ভিদ এই জলাবনের বৈশিষ্ট্যকে আরও আলাদা করে তুলেছে। বন গবেষণাসংক্রান্ত সরকারি নথিতেও রাতারগুলে বহু প্রজাতির উদ্ভিদ থাকার তথ্য পাওয়া যায়।

বৈঠার ছন্দে হারিয়ে যাওয়া


রাতারগুলের সৌন্দর্য দেখার সবচেয়ে সুন্দর উপায় নৌভ্রমণ। বর্ষায় যখন পানির উচ্চতা বাড়ে, তখন নৌকা বনের ভেতরের সরু চ্যানেল ধরে অনেকটা গভীরে যেতে পারে। জুন থেকে সেপ্টেম্বর বর্ষাকালকে সাধারণত এই জলাবনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় সময় ধরা হয়; পানি বেশি থাকলে পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা গাছের দৃশ্যটি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

নৌকা এগিয়ে চলে ধীরে।

কখনো মাঝি বৈঠা থামিয়ে দেন। তখন চারপাশে শুধু নীরবতা। বাতাসে পাতার মৃদু শব্দ, দূরে কোনো পাখির ডাক আর পানিতে নৌকার হালকা দুলুনি—সব মিলিয়ে এমন এক প্রশান্তি তৈরি হয়, যা শহুরে জীবনে প্রায় অচেনা।

কখনো আবার সূর্যের আলো গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে সরাসরি পানিতে এসে পড়ে। মুহূর্তেই কালচে-সবুজ পানির ওপর ছড়িয়ে পড়ে রুপালি ঝিলিক।

এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরে রাখা যায়, কিন্তু অনুভূতিটা ক্যামেরায় ধরা যায় না।

শুধু সৌন্দর্য নয়, জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়


রাতারগুলকে শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব পুরোপুরি বোঝা যাবে না। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, সরীসৃপ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর দেখা মেলে। সরকারি পর্যটন তথ্যেও মাছরাঙা, পানকৌড়ি, টিয়া, বুলবুলি, ঘুঘু, শিকারি পাখিসহ নানা পাখির উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তাই নৌকায় ঘোরার সময় শুধু গাছের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। একটু মনোযোগ দিয়ে শুনলে কিংবা নিরবে বসে থাকলে হঠাৎই চোখে পড়ে যেতে পারে কোনো পাখি। পানির ধারে কিংবা গাছের আড়ালে দেখা মিলতে পারে জলজ প্রাণীরও।

এ কারণেই রাতারগুলের সৌন্দর্য শুধু চোখের নয়—এটি একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্রের সৌন্দর্য।

বর্ষা পেরোলেই বদলে যায় রাতারগুল


রাতারগুলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো ঋতুর সঙ্গে এর চেহারা বদলে যাওয়া।

বর্ষায় যে বন পানিতে ডুবে থাকে, শুষ্ক মৌসুমে সেখানে পানি অনেকটাই কমে যায়। তখন নৌকা নিয়ে বনের গভীরে যাওয়ার সুযোগও সীমিত হয়। তবে শীত ও শুষ্ক মৌসুমে বনকে অন্যরকমভাবে দেখা যায়—পানির নিচে লুকিয়ে থাকা মাটির অংশ, গাছের শিকড় এবং বনভূমির কাঠামো তখন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তবে রাতারগুলের সেই বহুল পরিচিত ‘পানির মধ্যে বন’ দেখতে চাইলে বর্ষাকালই সবচেয়ে আকর্ষণীয় সময়।

কাঠের টাওয়ারের স্মৃতিও আছে


একসময় পর্যটকদের ওপর থেকে জলাবনের সৌন্দর্য দেখার সুযোগ করে দিতে এখানে পর্যবেক্ষণ টাওয়ার নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে কাঠামো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় পর্যটকদের সেখানে ওঠা বন্ধ করে দেওয়া হয়।

ফলে বর্তমানে রাতারগুলকে কাছ থেকে অনুভব করার প্রধান মাধ্যম নৌকা। আর সেটিই হয়তো এই ভ্রমণের সবচেয়ে বড় আনন্দ—আপনি দূর থেকে বন দেখবেন না, বরং বনের ভেতর দিয়েই এগিয়ে যাবেন।

প্রকৃতির কাছে গেলে প্রকৃতিকেও বাঁচাতে হবে


রাতারগুল যত জনপ্রিয় হচ্ছে, ততই বাড়ছে পর্যটকের চাপ। তাই এই জলাবনে ভ্রমণের সময় কিছু বিষয় মনে রাখা জরুরি।

প্লাস্টিক বা খাবারের প্যাকেট পানিতে ফেলা যাবে না। গাছের ডালপালা ভাঙা কিংবা বন্যপ্রাণীকে বিরক্ত করা যাবে না। নৌকায় চলার সময় অতিরিক্ত শব্দ না করাই ভালো।

কারণ রাতারগুল কোনো বিনোদন পার্ক নয়। এটি একটি প্রাকৃতিক জলাভূমি, যেখানে মানুষের আগে থেকেই বসবাস করছে অসংখ্য উদ্ভিদ ও প্রাণী।

যাওয়ার আগে যা জানা দরকার

ঢাকা থেকে বাস, ট্রেন বা বিমানে সিলেট যাওয়া যায়। সিলেট শহর থেকে সিএনজি, অটোরিকশা, মাইক্রোবাস বা ব্যক্তিগত গাড়িতে গোয়াইনঘাটের দিকে যেতে হবে। এরপর নির্ধারিত ঘাট থেকে নৌকা নিয়ে জলাবনের ভেতরে প্রবেশ করতে হয়।

বর্ষাকালে বৃষ্টি মাথায় রেখেই প্রস্তুতি নেওয়া ভালো। সঙ্গে রাখা উচিত পানিরোধী ব্যাগ, অতিরিক্ত কাপড়, পানির বোতল, প্রয়োজনীয় ওষুধ, মশা প্রতিরোধক এবং মোবাইল বা ক্যামেরার জন্য ওয়াটারপ্রুফ কভার।

নৌকায় ওঠার আগে ভাড়া ও ভ্রমণের সময় স্থানীয়ভাবে নিশ্চিত করে নেওয়াও ভালো, কারণ মৌসুম ও নৌকার ধরন অনুযায়ী খরচ পরিবর্তিত হতে পারে।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—নৌকায় নিরাপত্তার বিষয়টি অবহেলা না করা।

ফেরার পথে

ফেরার সময় নৌকা যখন ধীরে ধীরে ঘাটের দিকে এগিয়ে যায়, তখন মনে হয় কিছু একটা পেছনে ফেলে যাচ্ছি।

একটু আগে যে গাছগুলো মাথার ওপর ছায়া তৈরি করছিল, সেগুলো ক্রমেই দূরে সরে যায়। পানির বুকের সবুজ প্রতিবিম্ব ছোট হতে থাকে। বৈঠার শব্দও ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়।

কিন্তু রাতারগুল আসলে সেখানেই শেষ হয় না।

শহরে ফিরে যান, ব্যস্ততার মধ্যে ঢুকে পড়ুন—তারপরও হঠাৎ কোনো বৃষ্টিভেজা সকালে মনে পড়ে যাবে সেই জলপথ। মনে পড়বে পানির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলো, নৌকার দুলুনি, মাঝির বৈঠার শব্দ আর সবুজের ভেতর সেই অদ্ভুত নীরবতা।

তখন হয়তো মনে হবে—কিছু ভ্রমণ শুধু কোনো জায়গা দেখার জন্য হয় না। কিছু ভ্রমণ মানুষকে নিজের ভেতর একটু নীরবতা খুঁজে দিতেও হয়।

রাতারগুল তেমনই এক ভ্রমণ।

কল্পনার চেয়ে সুন্দর, আর বাস্তবের চেয়ে বেশি স্বপ্নময়—জলের আয়নায় দাঁড়িয়ে থাকা সেই সবুজ বন।

এফএইচ/বিএ/পিআর

সর্বোচ্চ পঠিত - Breaking News

আপনার জন্য নির্বাচিত