ঢাকা, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
১২ কার্তিক, ১৪৩৩

/ Breaking News

অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযান, ৮ মাসেই মন্ত্রিসভা ছাড়ছেন ইশরাক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৮:২৮, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযান, ৮ মাসেই মন্ত্রিসভা ছাড়ছেন ইশরাক

মাদকবিরোধী অভিযানে হাতে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে অংশগ্রহণের ঘটনায় বিতর্কের মুখে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়ছেন ইশরাক হোসেন। সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুপুর ২টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম হলে সংবাদ সম্মেলনে পদত্যাগের চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়ার কথা জানান তিনি।

এর আগে সোমবার সকালে নিজের ফেসবুক পোস্টে পদত্যাগের ঘোষণা দেন ইশরাক। তিনি জানান, নির্ধারিত সময়ে সংবাদ সম্মেলন করে সাংবাদিকদের সামনে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরবেন।

গত শনিবার রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে ইশরাক হোসেনকে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে দেখা যায়। অভিযানের ওই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। পরে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিতর্ক তৈরি হয়।

সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবে যাওয়ার পথে সাংবাদিকদের ইশরাক বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গিয়েই বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দল তাঁর পদত্যাগ চায়নি; বরং দলের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাঁকে এ সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়লেও মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাবেন। এ ক্ষেত্রে আরও কঠোর ও আগ্রাসী ভূমিকা নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

অস্ত্র বের করার ব্যাখ্যা

গেন্ডারিয়ার ঘটনার ব্যাখ্যায় ইশরাক জানিয়েছেন, ঘটনাস্থলে অবস্থানকালে একটি ভবনের ছাদ থেকে দুটি গুলি ছোড়া হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন। এ ছাড়া তাঁদের প্রবেশের সময় ২৫ থেকে ৩০ জন একসঙ্গে বেরিয়ে আসেন। তাঁর নিরাপত্তাকর্মীদের চিৎকার-চেঁচামেচির মধ্যে কেউ অস্ত্র বের করছেন বলে আশঙ্কা করে তিনি কোমর থেকে পিস্তল বের করেন।

এর আগে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইশরাক দাবি করেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নিজস্ব গোয়েন্দা সূত্র থেকে নিরাপত্তাঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় তিনি ও তাঁর সরকারি নিরাপত্তারক্ষীরা আত্মরক্ষার জন্য অল্প সময়ের জন্য অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেন।

তবে অস্ত্র হাতে তাঁর উপস্থিতির ভিডিও প্রকাশের পর ঘটনাটি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। মাদকবিরোধী অভিযানে জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তাদের ভূমিকা এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অভিযোগ নিয়েও আলোচনা শুরু হয়।

প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক বার্তা

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইশরাক হোসেনকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন। পরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানান ইশরাক।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের আচরণ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে তার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই—এমন বার্তা দেওয়া হয়েছে। তবে গেন্ডারিয়ার ঘটনায় আইন লঙ্ঘন হয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ইশরাকের কর্মকাণ্ডে ক্ষমতা প্রদর্শন, অপরিপক্বতা ও ঔদ্ধত্যের প্রকাশ ঘটেছে। তাঁর মতে, পরিণতিবোধের অভাবে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত অন্যদের জন্যও কঠোর বার্তা।

রাজনৈতিক জীবনে আগেও বিতর্ক

ইশরাক হোসেন বিএনপির প্রয়াত নেতা ও অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার ছেলে। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পর পুরান ঢাকায় দলীয় কর্মসূচি ও সরকারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়ে পরিচিতি পান তিনি।

২০২০ সালের ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ছিলেন ইশরাক। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপস জয়ী হন। পরে নির্বাচনের ফল নিয়ে আইনি লড়াই করেন ইশরাক। ২০২৫ সালের মার্চে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল তাঁকে মেয়র ঘোষণা করলেও শপথ গ্রহণ নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়। এ নিয়ে তাঁর সমর্থকদের আন্দোলনের সময় নগর ভবনের নাগরিক সেবা ব্যাহত হওয়ার ঘটনাও সমালোচনার জন্ম দেয়।

এ ছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও যোদ্ধাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য এবং জাতীয় স্মৃতিসৌধে স্যালুট দেওয়ার ঘটনাও তাঁকে ঘিরে আলোচনার সৃষ্টি করেছিল।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৬ আসন থেকে জয়ী হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান ইশরাক হোসেন। তবে দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় আট মাসের মাথায় মাদকবিরোধী অভিযানে অস্ত্র হাতে তাঁর উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে বিতর্কের জেরে প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি।

পদত্যাগের পরও মাদকের বিরুদ্ধে কাজ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ইশরাক। এখন গেন্ডারিয়ার ঘটনার তদন্ত, মাদকবিরোধী অভিযানে সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা এবং তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক পদক্ষেপের দিকে নজর থাকবে।

এফএইচ/বিএ/পিআর

সর্বোচ্চ পঠিত - Breaking News

আপনার জন্য নির্বাচিত