পদ্মার চর দখল নিয়ে কালু-কাকন বাহিনীর ভয়াবহ গোলাগুলি, আতঙ্কে কৃষকরা
পাবনা সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০১:৪০, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
পদ্মা নদীর চরের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে পাবনা ও কুষ্টিয়া সীমান্তবর্তী এলাকায় দুই অস্ত্রধারী গোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলা এ সংঘর্ষে ডিগ্রির চর ও আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। চরের কৃষিজমিতে কাজ করতে থাকা কৃষকেরা প্রাণভয়ে ছোটাছুটি করে নিরাপদ আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেন।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, ‘কালু বাহিনী’ ও ‘কাকন বাহিনী’ নামে পরিচিত দুই সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে এই সংঘর্ষ হয়। দুই পক্ষের গোলাগুলিতে কেউ হতাহত হয়েছেন কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ।
পাবনার লক্ষ্মীকুণ্ডা নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ শফিকুল ইসলাম জানান, মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটার দিকে গোলাগুলি শুরু হয়। পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার পদ্মা নদীর ডিগ্রির চর এবং পদ্মা-গড়াই নদীর মোহনা এলাকায় সংঘর্ষ চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত।
চরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষ
স্থানীয় কয়েকজন কৃষকের দাবি, ডিগ্রির চর বেশ কিছুদিন ধরে ‘কালু বাহিনী’র নিয়ন্ত্রণে ছিল। মঙ্গলবার দুপুরে ‘কাকন বাহিনী’র সদস্যরা একটি ট্রলারে করে পদ্মা-গড়াই নদীর মোহনায় আসে। এরপর ডিগ্রির চর লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে শুরু করে তারা।
ঘটনার সময় চরের কৃষিজমিতে অন্তত অর্ধশত কৃষক কাজ করছিলেন বলে জানান স্থানীয়রা। হঠাৎ গুলির শব্দে তাঁরা আতঙ্কিত হয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছোটাছুটি শুরু করেন।
কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, কাকন বাহিনীর গুলির জবাবে চরে অবস্থানরত কালু বাহিনীর সশস্ত্র সদস্যরাও পাল্টা গুলি ছোড়ে। এতে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র গোলাগুলি শুরু হয়। একপর্যায়ে বিকেলের শেষ দিকে কাকন বাহিনীর সদস্যরা আরও দুটি ট্রলারে করে অতিরিক্ত লোকজন ও অস্ত্র নিয়ে আসে বলে দাবি করেন স্থানীয়রা। তাঁদের ভাষ্য, সন্ধ্যা পর্যন্ত দুই পক্ষের মধ্যে কয়েকশ রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়। তবে গোলাগুলির এ সংখ্যা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
‘চাষাবাদ করতে এসেও প্রাণের ভয়’
চরের কৃষকেরা জানান, নদীর চরে কৃষিকাজ করেই তাঁদের অনেকের জীবিকা চলে। কিন্তু সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সংঘর্ষের কারণে জমিতে কাজ করতে গিয়ে তাঁদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
এক কৃষক বলেন, “আমরা গরিব মানুষ, চরের জমিতে চাষাবাদ করে জীবনযাপন করি। মাঝেমধ্যে এ ধরনের পরিস্থিতিতে পড়লে আমরা খুবই ভয়ে থাকি। দুপক্ষের গোলাগুলির মাঝে পড়ে কখন যে প্রাণ চলে যায়, সেই আতঙ্কে থাকতে হয়।”
তিনি এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে মুক্তি এবং চরে নিরাপদে চাষাবাদ করার পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান।
ঘটনাস্থলে নৌ পুলিশ ও থানা পুলিশের অভিযান
রাজশাহী নৌ পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন বলেন, দুপুরে গোলাগুলির খবর পাওয়ার পরপরই ঘটনাস্থলে নৌ পুলিশের একটি দল পাঠানো হয়। পরে ঈশ্বরদী থানা পুলিশের সদস্যরাও তাদের সঙ্গে অভিযানে যোগ দেন।
তিনি জানান, সন্ধ্যার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। এরপর পুলিশ বা কৃষকদের কেউ আর গুলির শব্দ শুনেছেন বলে খবর পাওয়া যায়নি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
পুলিশ সুপার আরও বলেন, এর আগে এসব বাহিনীর সদস্যদের গ্রেপ্তারে যৌথ বাহিনীর অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল। প্রয়োজন হলে আবারও অভিযান চালানো হবে এবং সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
পদ্মার চরাঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর এমন সংঘর্ষ স্থানীয় বাসিন্দা ও কৃষকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে কৃষিকাজের মৌসুমে গোলাগুলির ঘটনায় জমিতে কাজ করা মানুষ সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়ছেন।
তবে এ ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা, গোলাগুলিতে ব্যবহৃত অস্ত্রের ধরন এবং দুই পক্ষের সংঘর্ষের সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে পুলিশের পক্ষ থেকে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
এফএইচ/বিএ/পিআর