গাজার অসহায় শিশুদের পাশে হামজা, চিকিৎসার জন্য তুললেন দেড় কোটি টাকার বেশি
ক্রীড়া ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:২৭, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে হারিয়ে যাচ্ছে শৈশব, হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে অসংখ্য শিশু। কারও প্রয়োজন জরুরি অস্ত্রোপচার, কারও আবার বেঁচে থাকার জন্য দরকার নিরাপদ আশ্রয় ও উন্নত চিকিৎসা। গাজার এমন অসহায় শিশুদের পাশে দাঁড়িয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের তারকা মিডফিল্ডার হামজা চৌধুরী। মানবিক উদ্যোগে অংশ নিয়ে তিনি সংগ্রহ করেছেন ১ লাখ পাউন্ডের বেশি, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।
শুধু ফুটবল মাঠের পারফরম্যান্স নয়, মানবিক কাজেও নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই ফুটবলার। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) নিজের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে তহবিল সংগ্রহের খবর জানিয়ে অংশগ্রহণকারী, দাতা ও সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন হামজা।
তিনি লেখেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমরা গাজার শিশুদের জন্য ১ লাখ পাউন্ডের বেশি তহবিল সংগ্রহ করতে পেরেছি।’
জার্সি-পদক নিলামে উঠল, জমল মানবিক সহায়তা
যুক্তরাজ্যভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা নুজুম স্পোর্টসের সঙ্গে যৌথভাবে এই দাতব্য আয়োজন করেন হামজা। গত রোববার লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস টাউন হলে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে ছিল হামজাকে নিয়ে আলোচনা সভা এবং মুসলিম অ্যাথলেটদের স্বাক্ষরিত জার্সি, পদক ও বিভিন্ন স্মারকের দাতব্য নিলাম।
নিলামে হামজার লেস্টার সিটির হয়ে এফএ কাপজয়ী জার্সি বিক্রি হয় ৭ হাজার পাউন্ডে। আর কমিউনিটি শিল্ডজয়ী পদক বিক্রি হয় ৩ হাজার পাউন্ডে। টিকিট বিক্রি ও নিলাম থেকে পাওয়া পুরো অর্থ দেওয়া হয় ‘চিলড্রেন নট নাম্বারস’ নামের একটি সংস্থাকে।
সংগৃহীত অর্থ গাজার শিশুদের জরুরি চিকিৎসা সহায়তায় ব্যয় করা হবে। বিশেষ করে যেসব শিশুর জীবন বাঁচাতে বিদেশে বা নিরাপদ স্থানে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া প্রয়োজন, তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে এই অর্থ কাজে লাগবে বলে হামজা জানিয়েছেন।
‘প্রতিটি ছোট চেষ্টাও পার্থক্য গড়ে দিতে পারে’
হামজার কাছে এই উদ্যোগ কেবল অর্থ সংগ্রহের আয়োজন নয়; বরং যুদ্ধের ভয়াবহতায় বিপর্যস্ত শিশুদের পাশে দাঁড়ানোর একটি মানবিক প্রচেষ্টা। নিজের পোস্টে তিনি স্বীকার করেছেন, গাজার শিশুদের দুর্ভোগের তুলনায় এই সহায়তা সামান্য। তবু তাঁর বিশ্বাস, মানুষের সম্মিলিত ছোট ছোট উদ্যোগও বড় পরিবর্তনের পথ তৈরি করতে পারে।
হামজা লিখেছেন, অল্প সময়ের মধ্যে এই আয়োজনের মাধ্যমে যা অর্জিত হয়েছে, তাতে তিনি কৃতজ্ঞ ও বিনীত। তবে এত বড় দুর্ভোগের বিপরীতে এই অবদান খুবই সামান্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখনো অনেক কিছু করার বাকি। প্রতিটি প্রচেষ্টাই—তা যত ছোটই হোক—পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
ফুটবলের বাইরেও মানবিক পরিচয়
২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত নুজুম স্পোর্টস মুসলিম ক্রীড়াবিদদের সহায়তা, ক্ষমতায়ন ও অধিকার রক্ষায় কাজ করে। এই সংস্থার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে হামজার তহবিল সংগ্রহ গাজার শিশুদের চিকিৎসায় সহায়তার পাশাপাশি যুদ্ধের মানবিক বিপর্যয়ের দিকটিও সামনে এনেছে।
গাজায় দীর্ঘ সংঘাতের কারণে শিশুদের জীবন, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জরুরি চিকিৎসার জন্য অর্থ সংগ্রহের এই উদ্যোগ যুদ্ধবিধ্বস্ত শিশুদের প্রতি সংহতির বার্তা বহন করছে।
হামজার এই উদ্যোগে ফুটবলপ্রেমীদের কাছে আবারও স্পষ্ট হয়েছে—একজন খেলোয়াড়ের পরিচয় শুধু মাঠের গোল, জয় কিংবা ট্রফিতে সীমাবদ্ধ নয়। কখনো কখনো মানুষের পাশে দাঁড়ানোই হয়ে ওঠে তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন।
সামনে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ
এদিকে বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে সামনে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে খেলার কথা রয়েছে হামজার। আগামী ৫ নভেম্বর ভুটানের বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচে তিনি খেলতে পারবেন না। জাতীয় দলের কোচ টমাস ডুলির আশা, ৯ নভেম্বর থেকে দলের সঙ্গে যোগ দিতে পারেন হামজা। সে ক্ষেত্রে ১১ নভেম্বর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে তাঁকে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে মাঠের লড়াইয়ের আগে গাজার শিশুদের জন্য তাঁর এই মানবিক উদ্যোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। গোল কিংবা ট্রফির বাইরে অসহায় শিশুদের মুখে বেঁচে থাকার আশা ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও যে একজন ফুটবলারের বড় পরিচয় হতে পারে, হামজার উদ্যোগ যেন সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়।
এফএইচ/বিএ/পিআর