ডেঙ্গু-হামের ভয়াবহ থাবা, ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু ১৫ জনের
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০১:৩৩, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
দেশে ডেঙ্গু ও হামের প্রাদুর্ভাব ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। দুই রোগে গত ২৪ ঘণ্টায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৫ জন। এর মধ্যে ডেঙ্গুতে ৯ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন ৬ জন। একই সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৯৫৪ জন। অন্যদিকে, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হাম ও হামের উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৭০ জনে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পৃথক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত বুলেটিনে বলা হয়েছে, চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১৭ জনে। এর মধ্যে অক্টোবরের প্রথম ১২ দিনেই মারা গেছেন ৭১ জন। মাসভিত্তিক হিসাবে সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া আগস্টে ৪৩, জুলাইয়ে ৩৬, জুনে ১৩, মে মাসে একজন এবং জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুজন করে মারা গেছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৯৫৪ জন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩ হাজার ৩৯৬ জনে।
একই সময়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ১ হাজার ৯৬৫ জন। এ পর্যন্ত ডেঙ্গু থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন মোট ৯৭ হাজার ২৯৬ জন।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে, গত ২৪ ঘণ্টায় সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিভাগে—৮৪৫ জন। এ ছাড়া চট্টগ্রামে ৩১৮, খুলনায় ২৩০, বরিশালে ১৯৬, রাজশাহীতে ১৮৪, ময়মনসিংহে ৯৭ এবং রংপুরে ৭১ জন ভর্তি হয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার সকাল ৮টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ঢাকা বিভাগের তিনজন, চট্টগ্রাম বিভাগের দুজন এবং সিলেটের একজন রয়েছেন। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামে কারও মৃত্যু হয়নি।
গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন ১ হাজার ৬৬ জন। আর নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ১০৪ জনের। সব মিলিয়ে হাম ও হামের উপসর্গে প্রাণহানি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৭০ জনে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ১ হাজার ৭৪ জনের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ দেখা দেওয়া রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৭ হাজার ৩৭১ জনে।
একই সময়ে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন আরও ১৩৯ জন। ফলে চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে মোট ২২ হাজার ৭১২ জনের শরীরে।
এ সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৮৪ হাজার ২৬৯ জন। তাঁদের মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ১ লাখ ৭৬ হাজার ৬৭২ জন।
একসময় প্রায় নিয়ন্ত্রণে চলে আসা হাম আবারও বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রায় আট বছর ধরে দেশে হামে সংক্রমণের সংখ্যা ৪০০ ছাড়ায়নি। ২০২৫ সালে হাম দূরীকরণ এবং ২০২৬ সালে নির্মূলের সনদ পাওয়ার প্রত্যাশা থাকলেও চলতি বছরের পরিস্থিতি সেই আশাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৫ সালে হামের টিকাদান কার্যক্রমে অবহেলা বর্তমান প্রাদুর্ভাবের অন্যতম কারণ। চলতি বছরের শুরুতে সংক্রমণ দেখা দিলেও প্রথম থেকেই যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বলে তাঁদের মত। মার্চ থেকে সংক্রমণ ব্যাপকভাবে বাড়তে শুরু করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এপ্রিল ও মে মাসে গণটিকাদান কর্মসূচি চালানো হলেও সে সময় প্রায় ৪০ লাখ শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে যায়।
ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি, হাসপাতালে রোগীর চাপ এবং হামের উপসর্গে ব্যাপক প্রাণহানি—সব মিলিয়ে দেশের জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
এফএইচ/বিএ/পিআর