৪০ বছর পর জেগে উঠল মরুভূমি, আতাকামাজুড়ে শুধু ফুল আর ফুল
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৮:৪৮, ৩ অক্টোবর ২০২৬
যেখানে বৃষ্টির দেখা মেলা বিরল, যেখানে মাটি বছরের পর বছর পড়ে থাকে রুক্ষ ও প্রাণহীন—সেই আতাকামা মরুভূমিই এবার রূপ নিয়েছে বিশাল এক ফুলের বাগানে। চিলির পৃথিবীর অন্যতম শুষ্ক এই মরুভূমির বিস্তীর্ণ এলাকা এখন লাল, হলুদ, বেগুনি, সাদা ও কমলা বুনোফুলে ছেয়ে গেছে। দূর থেকে তাকালে মনে হচ্ছে, ধূসর মরুভূমির বুকজুড়ে কেউ যেন বিছিয়ে দিয়েছে হাজারো রঙের ফুলের চাদর।
বিরল এই প্রাকৃতিক দৃশ্যকে স্থানীয়ভাবে বলা হয় ‘দেসিয়ের্তো ফ্লোরিদো’—অর্থাৎ ‘ফুলেল মরুভূমি’। এবারের ফুল ফোটার ব্যাপ্তি ও বৈচিত্র্য এতটাই বেশি যে কয়েক দশক ধরে সুপ্ত থাকা আতাকামার উদ্ভিদজগত যেন একসঙ্গে জেগে উঠেছে।
চলতি বছরের শুরুতে এল নিনোর প্রভাবে আতাকামা অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হয়। সেই পানি মরুভূমির মাটির গভীরে দীর্ঘদিন ধরে সুপ্ত থাকা বীজ, কন্দ ও অন্যান্য উদ্ভিদাংশকে সক্রিয় করে। এরপর অনুকূল পরিবেশে সেগুলো অঙ্কুরিত হয়ে ফুলে পরিণত হয়।
ফলে যে মরুভূমিতে স্বাভাবিক সময়ে দেখা যায় শুষ্ক মাটি, পাথর আর ধূসর-বাদামি ভূদৃশ্য, সেটিই এখন পরিণত হয়েছে বর্ণিল ফুলের বিশাল প্রান্তরে।
কয়েক দশক পর জেগে উঠেছে মরুভূমি
আতাকামার জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ বিভাগের জীববিজ্ঞানী সেসার পিসারোর তথ্য অনুযায়ী, কোনো কোনো এলাকায় ১৬০ থেকে ১৯০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়েছে। চলতি বছরের জুলাই ও আগস্টে চিলির কয়েকটি অঞ্চলে রেকর্ড বৃষ্টিপাতও হয়েছে।
এই বৃষ্টির ফলে শুধু উদ্ভিদই নয়, মাটির নিচে দীর্ঘদিন সুপ্ত থাকা বিভিন্ন জৈব উপাদানও সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় ৩০ থেকে ৪০ বছর বা তারও বেশি সময় পর আবার সবুজ উদ্ভিদ ও ফুলের দেখা মিলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মরুভূমির কিছু বীজ ও ভূগর্ভস্থ উদ্ভিদাংশ দীর্ঘ সময় প্রতিকূল পরিবেশে সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। পর্যাপ্ত আর্দ্রতা ও উপযুক্ত পরিবেশ পেলে সেগুলো আবার জীবনচক্র শুরু করে।
২০০টির বেশি প্রজাতির ফুল
এবার আতাকামার বিভিন্ন এলাকায় ২০০টিরও বেশি প্রজাতির উদ্ভিদ ও ফুলের দেখা মিলছে। লাল ও হলুদ নানুকা, বেগুনি রক পার্সলেন, সাদা সুসপিরোস এবং কমলা টেরসিওপেলোসসহ নানা রঙের ফুলে ঢেকে গেছে মরুভূমির পাহাড়, সমতলভূমি ও গিরিখাত।
স্থানীয় উদ্ভিদ ‘গাররা দে লেওন’-এরও দেখা মিলছে বিভিন্ন এলাকায়। ফলে সাধারণ সময়ে শুষ্ক ও বাদামি রঙের আতাকামা এখন রূপ নিয়েছে সবুজ ও বর্ণিল প্রাকৃতিক প্রান্তরে।
১৯৯৭ সালের পর বড় ফুলেল আয়োজন
সংরক্ষণ কর্তৃক্ষের হিসাবে, এবার প্রায় ১৭ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে ফুলের বিস্তার ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পর এবারই সবচেয়ে বিস্তৃত ও তীব্র ‘দেসিয়ের্তো ফ্লোরিদো’ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রাকৃতিক এই পরিবর্তন শুধু আতাকামার সৌন্দর্যই বাড়ায়নি, বরং দীর্ঘদিন শুষ্ক অবস্থায় থাকা অঞ্চলের জীববৈচিত্র্যের একটি বিরল চিত্রও সামনে এনেছে।
ফুল দেখতে বাড়ছে পর্যটক
অসাধারণ এই প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে চিলির বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পর্যটকেরা ছুটে আসছেন। বিদেশি পর্যটকদের মধ্যেও আতাকামার ফুলেল রূপ দেখার আগ্রহ তৈরি হয়েছে। দুর্গম ও প্রতিকূল ভূপ্রকৃতির মধ্যেও মানুষ ভিড় করছেন এই বিরল প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করতে।
চিলির জাতীয় পর্যটন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রাকৃতিক এই ফুলেল দৃশ্য নভেম্বরের শেষ পর্যন্ত থাকার আগে আতাকামা অঞ্চলে প্রায় ৩ লাখ পর্যটকের আগমন হতে পারে।
দীর্ঘদিনের খরার পর বৃষ্টির ছোঁয়ায় আতাকামার এই রূপান্তর তাই শুধু একটি দৃষ্টিনন্দন প্রাকৃতিক দৃশ্য নয়; এটি মরুভূমির সুপ্ত জীবনের জেগে ওঠারও এক বিরল উদাহরণ।
এফএইচ/বিএ/পিআর