চুম্বন থেকে শয্যাদৃশ্য—বলিউডের ঘনিষ্ঠ শুটিংয়ে ‘গোপন’ দায়িত্বে যাঁরা, বদলাচ্ছে নিয়ম
বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:২৮, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
পর্দায় চুম্বন, শয্যাদৃশ্য কিংবা ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত দেখে দর্শকের মনে নানা প্রশ্ন জাগতে পারে। কিন্তু ক্যামেরার সামনে এসব দৃশ্য ধারণের সময় অভিনয়শিল্পীদের স্বাচ্ছন্দ্য, সম্মতি ও ব্যক্তিগত সীমারেখা কীভাবে রক্ষা করা হয়? বলিউডে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বাড়ছে এক বিশেষ পেশার গুরুত্ব—‘ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটর’ বা অন্তরঙ্গ দৃশ্য সমন্বয়ক।
একসময় ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের শুটিংয়ে অনেকটাই নির্ভর করা হতো পরিচালক ও অভিনয়শিল্পীদের পারস্পরিক বিশ্বাসের ওপর। কোথায় হাত রাখা যাবে, কতটা শারীরিক সংস্পর্শ থাকবে কিংবা কোনো দৃশ্যের সীমা কোথায় শেষ হবে—এসব বিষয়ে সব সময় স্পষ্ট পরিকল্পনা থাকত না। কিন্তু চলচ্চিত্রশিল্পে যৌন হয়রানি ও সম্মতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা জোরালো হওয়ার পর বদলাতে শুরু করেছে সেই চর্চা।
বিশেষ করে #মিটু আন্দোলনের পর শুটিং সেটে অভিনয়শিল্পীদের নিরাপত্তা এবং ব্যক্তিগত সীমারেখা রক্ষার বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। পশ্চিমা চলচ্চিত্রশিল্পের পাশাপাশি ভারতেও ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের শুটিংয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পেশাজীবীদের যুক্ত করার প্রবণতা বাড়ছে।
ক্যামেরার সামনে ঘনিষ্ঠতা, পেছনে থাকে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা
ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটরের কাজ শুধু চুম্বন বা শয্যাদৃশ্যের শুটিং তদারক করা নয়। কোন দৃশ্যে কী ধরনের শারীরিক সংস্পর্শ থাকবে, অভিনয়শিল্পীরা কোন বিষয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন এবং কীভাবে তাঁদের সম্মতি নিশ্চিত করা হবে—এসব বিষয় আগেই নির্ধারণে সহায়তা করেন তাঁরা।
বলিউডের এই পেশার পরিচিত মুখ আস্থা খান্না। তাঁর ভাষায়, যেভাবে একজন স্টান্ট পরিচালক মারামারির দৃশ্যের প্রতিটি নড়াচড়া পরিকল্পনা করেন, তেমনি ঘনিষ্ঠ দৃশ্যেও হাতের অবস্থান থেকে শুরু করে চুল কীভাবে থাকবে, তা আগেই ঠিক করে দেওয়া হয়। এতে শুটিংয়ের সময় অস্বস্তিকর বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা কমে।
অভিনয়শিল্পীদের ব্যক্তিগত সীমারেখা রক্ষায় ব্যবহৃত হয় বিশেষ সুরক্ষাসামগ্রীও। শরীরের নির্দিষ্ট অংশ ঢাকার প্যাচ, সুরক্ষাবস্ত্র এবং দুই অভিনয়শিল্পীর মধ্যে সরাসরি সংস্পর্শ কমাতে বিশেষ কুশন ব্যবহার করা হতে পারে। এসব ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হলো, দৃশ্যের প্রয়োজনে অভিনয় হলেও যেন কারও সম্মতি বা স্বাচ্ছন্দ্য উপেক্ষিত না হয়।
চুক্তির আগেই জানার সুযোগ, কোন দৃশ্যে অভিনয় করতে হবে
আস্থা খান্নার মতে, অভিনয়শিল্পী নির্বাচনের প্রক্রিয়ার শুরুতেই ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটর যুক্ত থাকলে চিত্রনাট্যে ঘনিষ্ঠ দৃশ্য থাকার বিষয়টি আগেভাগে জানানো সম্ভব হয়। এতে চুক্তিতে সই করার আগে অভিনয়শিল্পীরা বুঝে নিতে পারেন, তাঁরা ওই দৃশ্যে অভিনয় করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন কি না।
এই প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শুটিং সেটে গিয়ে হঠাৎ কোনো ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের মুখোমুখি হওয়া অভিনয়শিল্পীর জন্য বিব্রতকর হতে পারে। আগে থেকে দৃশ্যের ধরন, শারীরিক সংস্পর্শের সীমা এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হলে কাজের পরিবেশ আরও স্বচ্ছ হয়।
আস্থা খান্না জানিয়েছেন, এমন ঘটনাও ঘটেছে যেখানে সহ-অভিনেত্রীর সম্মতি ছাড়াই তাঁকে চুম্বন করেছেন কোনো অভিনেতা। ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটরের ভূমিকা হলো, দৃশ্যের নির্ধারিত সীমা যেন অতিক্রম না করা হয় এবং শুটিংয়ের স্বাভাবিক গতির মধ্যেও সম্মতির বিষয়টি যেন উপেক্ষিত না থাকে, তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করা।
‘গেহরাইয়াঁ’ থেকে বাড়ছে চর্চা
ভারতের মূলধারার হিন্দি চলচ্চিত্রে ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেশনের আলোচিত প্রাথমিক উদাহরণগুলোর একটি হলো দীপিকা পাড়ুকোন ও সিদ্ধান্ত চতুর্বেদী অভিনীত ‘গেহরাইয়াঁ’। ২০২২ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটিতে ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের পরিকল্পনায় আস্থা খান্না কাজ করেন। পাশাপাশি ইনটিমেসি কোচ নেহা ব্যাসো অভিনয়শিল্পীদের শারীরিক সম্পর্কের দৃশ্য এবং সম্মতি নিয়ে কর্মশালা পরিচালনা করেন।
এরপর স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের জন্য নির্মিত বিভিন্ন চলচ্চিত্র ও সিরিজে এ ধরনের পেশাজীবীদের যুক্ত করার প্রবণতা দেখা যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্ট্রিমিং কনটেন্টে সম্পর্ক ও যৌনতার তুলনামূলক খোলামেলা উপস্থাপনাও এই পরিবর্তনের অন্যতম কারণ।
‘মির্জাপুর’ সিরিজের অভিনেত্রী রসিকা দুগ্গালও ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটরের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সিরিজটির শুরুর মৌসুমগুলোতে অভিনয়শিল্পীদের নিজেদের স্বাচ্ছন্দ্য ও সীমারেখা ব্যক্তিগতভাবে সামলাতে হতো। এ ধরনের বিশেষজ্ঞ যুক্ত থাকলে প্রত্যেকের উদ্বেগ শোনা এবং কারও ব্যক্তিগত সীমা লঙ্ঘিত না হওয়ার বিষয়টি আরও সংগঠিতভাবে দেখা সম্ভব।
চুম্বনেও বিধিনিষেধ, প্রতীকের আড়ালে যৌনতার ইঙ্গিত
বলিউডে পর্দায় শারীরিক ঘনিষ্ঠতা দীর্ঘদিন ধরে নানা সামাজিক ও সেন্সরসংক্রান্ত বিধিনিষেধের মুখে ছিল। সরাসরি চুম্বন বা যৌনমিলনের দৃশ্য দেখানোর বদলে অনেক নির্মাতা ফুলের স্পর্শ, ঢেউয়ের আছড়ে পড়া কিংবা আগুনের শিখার মতো প্রতীকী দৃশ্য ব্যবহার করে আকাঙ্ক্ষা ও ঘনিষ্ঠতার ইঙ্গিত দিতেন।
তবে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের বিস্তার এবং গল্প বলার ধরনে পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্ক ও যৌনতার বাস্তবসম্মত উপস্থাপনার চাহিদা বেড়েছে। এর ফলে ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের শুটিংয়ে পেশাদার পরিকল্পনা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রয়োজনও সামনে এসেছে।
তবু ভারতে ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটরদের ব্যবহার এখনো সর্বজনীন নয়। চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনশিল্প মিলিয়ে এ পেশায় যুক্ত মানুষের সংখ্যা এখনো সীমিত। অনেক বড় বাজেটের ছবিতে তাঁদের নিয়োগ দেওয়া হয় না; কোথাও আবার পরিচালক নিজেই ঘনিষ্ঠ দৃশ্য পরিচালনা করেন। এ ক্ষেত্রে সবার জন্য বাধ্যতামূলক অভিন্ন নির্দেশিকাও নেই।
শুধু রোমান্স নয়, সহিংস দৃশ্যেও গুরুত্বপূর্ণ
ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেশনের পরিসর কেবল রোমান্টিক বা যৌন দৃশ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নগ্নতা, হয়রানি, আধিপত্য বিস্তার কিংবা যৌন সহিংসতার মতো সংবেদনশীল দৃশ্যেও অভিনয়শিল্পীদের সম্মতি, নিরাপত্তা ও মানসিক স্বাচ্ছন্দ্য বিবেচনায় রাখা জরুরি।
আস্থা খান্নার মতে, ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের পরিসর অনেক বড়; এর সঙ্গে এমন অভিজ্ঞতাও যুক্ত থাকতে পারে, যা অভিনয়শিল্পীদের জন্য মানসিকভাবে কঠিন। তাই দৃশ্যের প্রয়োজনে অভিনয় করলেও কেউ যেন অনাকাঙ্ক্ষিত অভিজ্ঞতা বা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক আঘাতের মুখে না পড়েন, সে বিষয়ে আগাম পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ।
বলিউডের এই পরিবর্তন এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। তবে ক্যামেরার সামনে ঘনিষ্ঠতার দৃশ্য যতই বাস্তবসম্মত হোক, ক্যামেরার পেছনে সম্মতি, নিরাপত্তা ও পেশাদার পরিকল্পনার গুরুত্ব যে বাড়ছে, তা স্পষ্ট।
এফএইচ/বিএ/পিআর