ভালোবাসা, অনুশোচনা আর আত্মোপলব্ধির গল্প নিয়ে আসছে ‘শিশির ভেজা চোখ’
বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১:৪৭, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
সময় বদলেছে, বদলেছে মানুষের জীবনযাপন ও সম্পর্কের ভাষা। কিন্তু ভালোবাসা, অভিমান, অনুশোচনা আর প্রিয় মানুষকে নতুন করে চিনে নেওয়ার অনুভূতি কি কখনো বদলায়? সেই চিরন্তন মানবিক আবেগই এবার বড় পর্দায় তুলে ধরতে যাচ্ছেন পরিচালক দেওয়ান নাজমুল। অমর কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘স্বামী’ অবলম্বনে নির্মিত হচ্ছে তাঁর নতুন সিনেমা ‘শিশির ভেজা চোখ’। ইতোমধ্যে ঢাকা জেলার শ্রীনগরে শুরু হয়েছে ছবিটির শুটিং।
শরৎচন্দ্রের সাহিত্য বরাবরই মানুষের মনের গোপন দ্বন্দ্ব, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং সমাজের প্রচলিত ধারণার আড়ালে থাকা মানবিক সত্যকে সামনে এনেছে। সেই সাহিত্যিক আবহকে চলচ্চিত্রের ভাষায় তুলে ধরার চেষ্টা করছেন নির্মাতা। তাঁর বিশ্বাস, আধুনিকতার প্রভাবে সমাজে অনেক পরিবর্তন এলেও মানুষের মৌলিক আবেগ ও অনুভূতি আজও একই রকম রয়ে গেছে।
মিনি, ঘনশ্যাম ও নরেনের জটিল সম্পর্ক
‘শিশির ভেজা চোখ’-এর গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে মিনি, ঘনশ্যাম ও নরেন। ছোটবেলার প্রেমের স্মৃতি বুকে নিয়ে মিনির বিয়ে হয় বয়সে বড় ও বিপত্নীক ঘনশ্যামের সঙ্গে। কিন্তু মনের অমিল আর অনিচ্ছার এই সম্পর্ক শুরু থেকেই মিনির কাছে হয়ে ওঠে অস্বস্তি ও দূরত্বের। স্বামীর শান্ত, সহিষ্ণু ও দায়িত্বশীল আচরণের মধ্যেও সে সহজে খুঁজে পায় না ভালোবাসার অর্থ।
এরই মধ্যে পুরোনো প্রেমিক নরেনের ফিরে আসা মিনির জীবনে নতুন টানাপোড়েন তৈরি করে। অতীতের টান তাকে স্বামীর সংসার ছেড়ে চলে যাওয়ার দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘনশ্যামের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, ধৈর্য ও স্ত্রীর প্রতি তাঁর মর্যাদাবোধের প্রকৃত মূল্য বুঝতে শুরু করে মিনি।
একসময় যে মানুষটিকে মন থেকে গ্রহণ করতে পারেনি, তাঁর ভালোবাসার গভীরতা উপলব্ধি করেই নিজের ভুলের মুখোমুখি হয় সে। ফিরে আসে অনুশোচনা নিয়ে। গল্পের এই বাঁকে উঠে আসে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—ভালোবাসা কি কেবল আবেগের নাম, নাকি প্রিয় মানুষের প্রতি দায়িত্ব, সম্মান ও নিঃস্বার্থতার মধ্যেও তার গভীরতম প্রকাশ?
সম্পর্কের এই জটিল মনস্তত্ত্ব, ভুল সিদ্ধান্তের বেদনা এবং আত্মোপলব্ধির মধ্য দিয়ে ‘শিশির ভেজা চোখ’ দর্শকদের সামনে তুলে ধরতে চায় মানুষের হৃদয়ের চিরচেনা এক অধ্যায়।
রাজরিপার কাছে সৌদামিনী হয়ে ওঠার অভিজ্ঞতা বিশেষ
সিনেমাটিতে মিনি বা সৌদামিনী চরিত্রে অভিনয় করছেন রাজরিপা। চরিত্রটিকে পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে শুটিং শুরুর আগে গল্পটি পড়েছেন এবং চরিত্রের মানসিক অবস্থাকে নিজের ভেতর থেকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছেন বলে জানা গেছে।
শরৎচন্দ্রের সৃষ্টি করা একটি গুরুত্বপূর্ণ নারী চরিত্রে অভিনয়কে নিজের জন্য বিশেষ অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখছেন রাজরিপা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদামিনী হয়ে বড় পর্দায় আসা তাঁর জন্য সৌভাগ্যের বিষয়। শুটিং সেটে পরিচালকের কাছ থেকে ইতিবাচক মূল্যায়নও পেয়েছেন তিনি।
মিনির চরিত্রে রয়েছে প্রেম, অভিমান, দ্বিধা, ভুল সিদ্ধান্ত ও অনুশোচনার নানা স্তর। তাই চরিত্রটি পর্দায় বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে আবেগের সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো তুলে ধরা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
শরৎচন্দ্রের সাহিত্যকে অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা
ছবিটি নির্মাণের কারণ ব্যাখ্যা করে পরিচালক দেওয়ান নাজমুল বলেছেন, সাহিত্যকর্মটি অনেক পুরোনো হলেও মানুষের আবেগের কোনো পরিবর্তন হয়নি। আধুনিকতা ও ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রভাবে সমাজে বড় ধরনের রূপান্তর ঘটেছে, কিন্তু মানুষের শিকড় বদলায়নি।
কেন শরৎচন্দ্রের ‘স্বামী’ বেছে নিয়েছেন—এমন প্রশ্নে পরিচালক জানান, তাঁর অন্য লেখার তুলনায় ‘স্বামী’তেই তিনি লেখককে বেশি উপলব্ধি করেছেন। চলচ্চিত্রের প্রয়োজনে কিছু পরিমার্জন করা হলেও শরৎচন্দ্রের মূল চিন্তা, দর্শন ও সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা করছেন তিনি।
শরৎচন্দ্রের ‘স্বামী’ দীর্ঘদিন ধরে বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের কাছে পরিচিত একটি সাহিত্যকর্ম। সময় পেরিয়ে গেলেও এর সম্পর্ক, ভালোবাসা ও মানবিক উপলব্ধির বিষয়গুলো আজও প্রাসঙ্গিক বলেই চলচ্চিত্রে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন নির্মাতা।
একঝাঁক শিল্পী, অভিজ্ঞ নির্মাণদল
‘শিশির ভেজা চোখ’-এর বিভিন্ন চরিত্রে আরও অভিনয় করছেন শিপন মিত্র, সাব্বির আহমেদ, বদ্দা মিঠু, শিবা শানু, শিরীন আলম, রেশমী, ববি, জ্যাকি, ফিরোজ আলম, নৈরিতা ও অধরা চৌধুরীসহ অনেকে।
ছবিটির পরিচালনার পাশাপাশি চিত্রনাট্য, সংলাপ সংযোজন ও গীত রচনার দায়িত্বও পালন করছেন দেওয়ান নাজমুল। চিত্রগ্রহণ করছেন তপন আহমেদ। সংগীত পরিচালনায় রয়েছেন আলাউদ্দিন হক ও আলী আশরাফ। সম্পাদনার দায়িত্বে আছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত সম্পাদক মো. শহিদুল হক। এমপ্যাথি প্রযোজিত সিনেমাটির সার্বিক ব্যবস্থাপনায় রয়েছেন মো. আলমগীর হোসেন।
এর আগে দেওয়ান নাজমুল যৌথ প্রযোজনায় ‘সীমারেখা’ এবং নিজস্ব প্রযোজনায় ‘নাকফুল’ ও ‘তোরে কত ভালোবাসি’ সিনেমা নির্মাণ করেছেন। নাটকও পরিচালনা করেছেন তিনি। নতুন ছবির মধ্য দিয়ে এবার বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী এক গল্পকে নতুন প্রজন্মের দর্শকের সামনে তুলে ধরতে চান এই নির্মাতা।
যে গল্পে চোখ ভেজে, বদলে যায় উপলব্ধি
‘শিশির ভেজা চোখ’ কেবল একটি প্রেমের গল্প নয়; এর কেন্দ্রে রয়েছে মানুষকে বুঝতে শেখা, সম্পর্কের মূল্য উপলব্ধি করা এবং ভুলের পরও ফিরে আসার মানসিক শক্তি। কখনো কাছে থেকেও মানুষ প্রিয়জনকে চিনতে পারে না, আবার কখনো হারানোর আশঙ্কাই চোখ খুলে দেয় ভালোবাসার প্রকৃত অর্থের সামনে।
শরৎচন্দ্রের সাহিত্যকে নতুন করে পর্দায় উপস্থাপনের এই উদ্যোগে দর্শকের আগ্রহের বড় জায়গা হতে পারে সেই চিরন্তন অনুভূতিগুলোই—যেখানে ভালোবাসা মানে শুধু কাউকে পাওয়া নয়, বরং তাকে বোঝা, সম্মান করা এবং তার মানবিক মর্যাদাকে স্বীকার করা।
এফএইচ/বিএ/পিআর