ঢাকা, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
১২ কার্তিক, ১৪৩৩

/ Breaking News

যাকে দেখে হলভর্তি দর্শক কাঁপত, সেই জসীমই হয়ে উঠেছিলেন কোটি মানুষের নায়ক!

বিনোদন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১:৫২, ৮ অক্টোবর ২০২৬

যাকে দেখে হলভর্তি দর্শক কাঁপত, সেই জসীমই হয়ে উঠেছিলেন কোটি মানুষের নায়ক!

একসময় পর্দায় তাঁর নাম মানেই আতঙ্ক। দুর্ধর্ষ মারপিট, রুক্ষ সংলাপ আর ভয়ংকর উপস্থিতিতে সিনেমা হলের দর্শকের মনে কাঁপন ধরিয়ে দিতেন তিনি। সেই খলনায়কই একদিন হয়ে উঠলেন লাখো মানুষের প্রিয় নায়ক। কখনো শাবানার প্রেমিক, কখনো ভাই; কখনো ভয়ংকর ভিলেন, আবার কখনো নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর—এভাবেই ঢাকাই চলচ্চিত্রে নিজের আলাদা সাম্রাজ্য গড়েছিলেন চিত্রনায়ক জসীম।

১৯৯৮ সালের ৮ অক্টোবর মাত্র ৪৮ বছর বয়সে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে চলে যান এই কিংবদন্তি অভিনেতা। দেখতে দেখতে তাঁর প্রয়াণের ২৭ বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু জসীম কি সত্যিই হারিয়ে গেছেন? সিনেমার পর্দা থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—এখনো তাঁর সংলাপ, মারপিটের দৃশ্য আর অভিনয় নিয়ে মাতেন দর্শক।

খলনায়ক জসীমের ‘মাইর’ খেতেই হলে যেত দর্শক!

১৯৫০ সালের ১৪ আগস্ট ঢাকার নবাবগঞ্জের বক্সনগর গ্রামে জন্ম জসীমের। আসল নাম আবদুল খায়ের জসীম উদ্দিন। ছোটবেলা থেকেই ছিলেন সাহসী ও দুরন্ত। মুক্তিযুদ্ধেও অংশ নেন তিনি।

১৯৭২ সালে ‘দেবর’ ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে পা রাখেন জসীম। পরের বছর জহিরুল হকের ‘রংবাজ’ ছবিতে খলনায়কের চরিত্রে অভিনয় করে নজর কাড়েন। এরপর দেওয়ান নজরুলের ‘দোস্ত দুশমন’ যেন বদলে দেয় তাঁর ক্যারিয়ার।

হিন্দি ‘শোলে’র গব্বর সিং চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের মনে এমন ভয় ধরিয়েছিলেন যে, সিনেমা দেখতে যাওয়ার সময় দর্শকেরা মজা করে বলতেন—আজ জসীমের ‘মাইর’ খেতে যাচ্ছি!

মারপিটে জসীম, সামনে দাঁড়ানোই কঠিন!

জসীম শুধু অভিনেতা ছিলেন না, ঢাকাই চলচ্চিত্রের অ্যাকশন ধারার অন্যতম পথিকৃৎও ছিলেন। তাঁর হাত ধরে গড়ে ওঠে ‘ফাইটিং গ্রুপ’। পরবর্তী সময়ে এই দলের অনেক সদস্য ফাইট ডিরেক্টর ও স্টান্টম্যান হিসেবে চলচ্চিত্রে প্রতিষ্ঠিত হন।

‘আসামি হাজির’ ছবিতে ওয়াসিমের সঙ্গে তাঁর লড়াই দেখতে দর্শকদের উন্মাদনার গল্প এখনো চলচ্চিত্রাঙ্গনে আলোচিত। এমনকি তাঁর অভিনয়ের প্রশংসা করেছিলেন ভারতীয় অভিনেতা আমজাদ খানও।

হঠাৎ বদলে গেল সব, ভিলেন থেকে নায়ক!

যে জসীমকে দেখে দর্শক ভয় পেতেন, একসময় সেই জসীমের জন্যই সিনেমা হলে ভিড় জমাতে শুরু করলেন তাঁরা।

সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘সবুজ সাথী’ ছবিতে প্রথমবার নায়ক হন জসীম। ছবিটি সফল হওয়ার পর খলনায়কের অধ্যায় কার্যত শেষ। এরপর তাঁর হাতে উঠে আসে ন্যায়ের লড়াইয়ের পতাকা।

পর্দায় তিনি হয়ে উঠলেন নিপীড়িত মানুষের বন্ধু, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠ এবং সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি। অ্যাকশন দৃশ্যের পাশাপাশি তাঁর আবেগঘন অভিনয়ও দর্শকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।

শাবানার সঙ্গে কখনো প্রেম, কখনো ভাই!

জসীম-শাবানা জুটি ছিল ঢাকাই সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় জুটি। তবে তাঁদের সম্পর্কের রসায়ন ছিল বেশ বিচিত্র। কোনো সিনেমায় জসীম শাবানার প্রেমিক, আবার কোনো সিনেমায় ভাই!

‘ভাইবোন’, ‘মেয়েরাও মানুষ’, ‘পরিবার’ ও ‘বুকের ধন’-এর মতো ছবিতে পারিবারিক চরিত্রে দেখা গেছে তাঁকে। আবার ‘লালু মাস্তান’, ‘বারুদ’ ও ‘নবাবজাদা’র মতো সিনেমায় তিনি ছিলেন তুমুল অ্যাকশন হিরো।

একই অভিনেত্রীর সঙ্গে প্রেমিক ও ভাই—দুই চরিত্রেই সমান জনপ্রিয় হয়ে ওঠার ঘটনা ঢাকাই সিনেমায় খুব বেশি দেখা যায়নি।

রোজিনার সঙ্গেও জমেছিল রসায়ন

শাবানার পাশাপাশি রোজিনার সঙ্গেও জসীমের জুটি ছিল দর্শকের কাছে দারুণ জনপ্রিয়। আশির দশকে তাঁদের একাধিক সিনেমা ব্যবসায়িক সাফল্য পায়।

অ্যাকশন, প্রেম, পারিবারিক টানাপোড়েন কিংবা আবেগ—সব ধরনের চরিত্রেই নিজেকে মানিয়ে নিতে পারতেন জসীম। এ কারণেই অল্প সময়েই তিনি পরিণত হন ঢাকাই চলচ্চিত্রের বড় তারকায়।

দুই শতাধিক সিনেমায় দাপট

জসীম অভিনয় করেছেন প্রায় দুই শতাধিক চলচ্চিত্রে। ‘তুফান’, ‘জবাব’, ‘নাগ-নাগিনী’, ‘বদলা’, ‘বারুদ’, ‘সুন্দরী’, ‘কসাই’, ‘লালু মাস্তান’, ‘নবাবজাদা’, ‘অভিযান’, ‘কালিয়া’, ‘বাংলার নায়ক’, ‘গরিবের ওস্তাদ’, ‘রাজা বাবু’, ‘স্বামী কেন আসামী’, ‘মেয়েরাও মানুষ’ ও ‘বুকের ধন’সহ বহু সিনেমায় তাঁর অভিনয় আজও দর্শকের মনে গেঁথে আছে।

তাঁর সিনেমার গল্পে থাকত দরিদ্র মানুষের কষ্ট, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই, মায়ের প্রতি ভালোবাসা, প্রেম ও ত্যাগ। ফলে পর্দার চরিত্র পেরিয়ে জসীম হয়ে উঠেছিলেন সাধারণ মানুষের আপনজন।

যুদ্ধের নায়ক, সিনেমাতেও নায়ক

জসীমের জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়গুলোর একটি ছিল তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। বাস্তব জীবনের সেই সাহস যেন তাঁর অভিনয়েও প্রতিফলিত হয়েছিল।

পর্দায় তাঁর লড়াই, প্রতিবাদ, সংলাপ কিংবা চোখের জল—সবকিছুই দর্শকের কাছে অস্বাভাবিকভাবে বাস্তব মনে হতো। সম্ভবত এ কারণেই জসীমের নায়ক চরিত্র এত দ্রুত মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিল।

মৃত্যুর ২৭ বছর পরও ‘জসীম ট্রেন্ডিং’!

সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে চলচ্চিত্রের ভাষা, বদলে গেছে দর্শকের রুচি। কিন্তু জসীমের জনপ্রিয়তায় যেন মরচে পড়েনি।

ইউটিউব ও ফেসবুক রিলসে এখনো তাঁর মারপিটের দৃশ্য ভাইরাল হয়। তরুণেরা অনুকরণ করেন তাঁর সংলাপ। তাঁকে ঘিরে তৈরি হয় মিম, ভিডিও ও নানা ধরনের কনটেন্ট।

অর্থাৎ, যে নায়ক চলে গেছেন ২৭ বছর আগে, তিনি এখনো নতুন প্রজন্মের স্ক্রিনে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

শেষ পর্যন্ত জয়ী সেই ‘ভিলেন’

১৯৯৮ সালের ৮ অক্টোবর হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে থেমে যায় জসীমের জীবন। কিন্তু থামেনি তাঁর গল্প।

যে মানুষটি ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন খলনায়ক হিসেবে, শেষ পর্যন্ত তিনিই হয়ে উঠেছিলেন ন্যায়ের প্রতীক। যে মানুষকে একসময় দর্শক ভয় পেতেন, সেই মানুষটির জন্যই পরে কেঁদেছে লাখো হৃদয়।

ভিলেন থেকে নায়ক—জসীমের এই রূপান্তর শুধু একটি চলচ্চিত্রজীবনের গল্প নয়; এটি ঢাকাই সিনেমার ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়।

এফএইচ/বিএ/পিআর

সর্বোচ্চ পঠিত - Breaking News

আপনার জন্য নির্বাচিত