সরকারি দপ্তরে এক লাখ নিয়োগ আটকে গেল, কী বলছে অর্থ বিভাগ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:৩৮, ২১ অক্টোবর ২০২৬
সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে ১৬ থেকে ২০তম গ্রেডের প্রায় এক লাখ অস্থায়ী পদে নিয়োগ কার্যক্রম আটকে গেছে। আউটসোর্সিং নীতিমালা সংশোধনের পর নিয়োগপ্রক্রিয়ায় আইনি জটিলতা তৈরি হওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সমস্যা সমাধানে সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালায় প্রয়োজনীয় সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে অর্থ বিভাগ।
আটকে থাকা এসব পদের মধ্যে রয়েছে হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতাকর্মী, ল্যাব সহকারী, ট্রলিম্যান, সরকারি দপ্তর ও বাসভবনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ বিভিন্ন ধরনের সেবাকর্মী। কর্মীসংকটের কারণে সরকারি প্রতিষ্ঠানে সেবা কার্যক্রমও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ২১ সেপ্টেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয় ‘আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণ নীতিমালা, ২০২৫’ সংশোধন করে। নতুন নীতিমালায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে সরাসরি ব্যক্তির কাছ থেকে সেবা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরকে সরাসরি কর্মী নিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। অর্থ বিভাগের অনুমোদিত বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন সেন্টারের (আইআইএফসি) মাধ্যমেও কর্মী নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে সংশোধিত নীতিমালায় সরাসরি ব্যক্তির কাছ থেকে সেবা নেওয়ার সুযোগ থাকলেও সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালায় এ ধরনের চুক্তির সুস্পষ্ট বিধান নেই। ফলে একদিকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আগের নিয়মে নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না, অন্যদিকে নতুন পদ্ধতিতে নিয়োগের ক্ষেত্রেও আইনি বাধা তৈরি হয়েছে।
আইনি জটিলতা কাটাতে অর্থ বিভাগের উদ্যোগ
এ পরিস্থিতিতে অর্থ বিভাগ গত ২১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সরকারি ক্রয় কর্তৃপক্ষকে (বিপিপিএ) চিঠি দিয়ে সরকারি ক্রয় আইন, ২০০৬ এবং সরকারি ক্রয় বিধিমালা, ২০২৫-এ প্রয়োজনীয় সংশোধন আনার অনুরোধ জানিয়েছে।
অর্থ বিভাগের মতে, সরকারি কাজে গতিশীলতা আনা, স্বল্প সময়ে সেবা নিশ্চিত করা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানো এবং ব্যয় সাশ্রয়ের লক্ষ্যেই আউটসোর্সিং নীতিমালায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে নতুন নীতিমালা কার্যকর করতে হলে সরকারি ক্রয় আইনি কাঠামোর সঙ্গে এর সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে বিপিপিএ গত ১৪ অক্টোবর অর্থ মন্ত্রণালয়কে দেওয়া চিঠিতে সংশোধিত নীতিমালার বিভিন্ন দিক নিয়ে পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে। সংস্থাটি বলেছে, আউটসোর্সিং ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সরকারি দপ্তর ও সেবাকর্মীদের মধ্যে সরাসরি চুক্তিগত সম্পর্ক এড়ানো। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে এসব কর্মীকে রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত করার দাবিসহ সম্ভাব্য আর্থিক ও প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর লক্ষ্য ছিল।
বিপিপিএর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সরাসরি ব্যক্তির সঙ্গে চুক্তির সুযোগ তৈরি হলে আউটসোর্সিং ব্যবস্থার মৌলিক কাঠামো বদলে যেতে পারে। এতে আগের সমস্যাগুলো আবারও দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি ব্যক্তিপর্যায়ে চুক্তি বাস্তবায়ন, সেবাকর্মীদের দক্ষতা, চুক্তিগত দায় এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
এসব বিষয় সমন্বিতভাবে পর্যালোচনা করতে অর্থ বিভাগ, বিপিপিএ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটি।
স্বাস্থ্য খাতেই ২০ হাজার কর্মী নিয়োগের প্রস্তাব
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২০ হাজার সেবাকর্মী নিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধীন সরকারি বাসভবন ও দপ্তরের কাজে আরও প্রায় পাঁচ হাজার কর্মী নিয়োগ দেওয়ার কথা রয়েছে।
এ ছাড়া রেলপথ, সমাজকল্যাণ ও কৃষিসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং বিভাগের অধীনেও অস্থায়ী পদে কর্মী নিয়োগের প্রস্তাব আটকে রয়েছে। সব মিলিয়ে ১৬ থেকে ২০তম গ্রেডের প্রায় এক লাখ অস্থায়ী পদে নিয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের যুগ্ম সচিব আসিব আহসান জানান, চলমান দরপত্রের বিষয়ে করণীয় জানতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তাঁদের বিভাগের অধীন দৈনিক মজুরিভিত্তিক কয়েক হাজার সেবাকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা থাকলেও নীতিমালা স্পষ্ট না হওয়ায় কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া যাচ্ছে না।
আউটসোর্সিং নিয়ে দুই পক্ষের ভিন্নমত
আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের একাংশের অভিযোগ, চাকরি পেতে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে বড় অঙ্কের অর্থ দিতে হয়। চাকরিতে যোগ দেওয়ার পরও মাসিক বেতন থেকে একটি অংশ কেটে রাখা হয়। এ কারণে তাঁরা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে সরকারি ব্যবস্থাপনায় সরাসরি নিয়োগের দাবি জানিয়ে আসছেন।
অন্যদিকে বেসরকারি জনবল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকদের দাবি, তাঁদের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হলে কর্মীদের প্রশিক্ষণ, তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়। সরাসরি সরকারি ব্যবস্থাপনায় নিয়োগ চালু হলে বিপুলসংখ্যক কর্মীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং তাঁদের কার্যক্রম তদারকিতে সক্ষমতার ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
বাংলাদেশ আউটসোর্সিং ম্যানপাওয়ার প্রোভাইডার সোসাইটির সভাপতি আবু তালেবের দাবি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পাঁচ লাখের বেশি কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, এ ব্যবস্থা বন্ধ হলে সরকারি সেবায় বিশৃঙ্খলা বাড়তে পারে এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
কেন চালু হয়েছিল আউটসোর্সিং ব্যবস্থা
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি ব্যয় কমানো এবং বেতন-ভাতা ও পেনশনের আর্থিক চাপ নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য নিয়ে ২০০৮ সালে প্রথম আউটসোর্সিং নীতিমালা করা হয়। পরে ২০০৯ সাল থেকে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির বিভিন্ন অস্থায়ী পদে প্রচলিত সরকারি নিয়োগের পরিবর্তে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কর্মী নেওয়ার ব্যবস্থা সম্প্রসারিত হয়।
নীতিমালা অনুযায়ী, আউটসোর্সিংয়ের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির সঙ্গে সরাসরি চুক্তি না করে স্বীকৃত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করার বিধান ছিল। ২০১৮ ও ২০২৫ সালে এ নীতিমালা সংশোধন করা হয়।
সর্বশেষ সংশোধনের পর সরাসরি ব্যক্তির কাছ থেকে সেবা নেওয়ার সুযোগ এবং সরকারি ক্রয় আইনের মধ্যে অসামঞ্জস্য দেখা দেওয়ায় নিয়োগ কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। এখন সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালার প্রয়োজনীয় সংশোধন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে আটকে থাকা নিয়োগ কার্যক্রমের পরবর্তী অগ্রগতি।
এফএইচ/বিএ/পিআর