ভোরেই ফাঁস নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন, চক্রে সরকারি ৫ কর্মচারীসহ গ্রেপ্তার ৭
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০১:০৪, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
চাকরির প্রশ্ন ফাঁস, চক্রে ৫ সরকারি কর্মচারী! উদ্ধার ৪৮ পাতার ব্যাংক চেক
অনলাইন ডেস্ক
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি-৩)। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পাঁচ কর্মচারী রয়েছেন। তাঁদের কাছ থেকে প্রশ্নপত্র, প্রবেশপত্র, স্ট্যাম্প, ব্যাংক চেক, সনদপত্র, জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন সামগ্রী জব্দ করা হয়েছে।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসআরবির মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন।
তিনি জানান, গত ১০ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে ২৪২টি শূন্যপদের নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। এ পরীক্ষায় আবেদন করেছিলেন ৩ লাখ ১৯ হাজার চাকরিপ্রার্থী। সকাল ১১টায় পরীক্ষা শুরুর কথা থাকলেও ওই দিন সকাল ১০টা ৩ মিনিটে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর পরীক্ষা স্থগিত করা হয়।
ঘটনার পর এসআরবি ছায়া তদন্ত শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় ১৪ থেকে ১৬ অক্টোবর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় ১১ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে মতিঝিল থানায় মামলা করা হয়েছিল।
গ্রেপ্তার সাতজনের মধ্যে পাঁচজন সরকারি কর্মচারী
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন পরিবেশ অধিদপ্তরের ডেটা এন্ট্রি অপারেটর মো. রুবেল ইসলাম (৩৩), চাকরিপ্রার্থী মো. মফিজুল ইসলাম (২৩), মো. হাসিনুর রহমান সুজন (৩২), এনবিআরের কম্পিউটার অপারেটর এস এম ইমদাদুল ইসলাম (৩৫), প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলাম (৩৩), এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ (৩০) এবং এনবিআরে কর্মরত কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর (৩৮)।
এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক জানান, ১৪ অক্টোবর মতিঝিল এলাকা থেকে রুবেল, মফিজুল ও সুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উত্তরখান থেকে ইমদাদুল এবং এসআরবি-৪-এর সহায়তায় মিরপুর-১০ এলাকা থেকে আসাদুলকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনের কথোপকথন ও চ্যাট বিশ্লেষণ করে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১৫ অক্টোবর সাভার থেকে নূর মোহাম্মদ এবং পরদিন মোহাম্মদপুর থেকে জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ভোরে ছড়ায় প্রশ্নপত্র ও উত্তর
সংবাদ সম্মেলনে ফায়েজুল আরেফীন বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনের চ্যাট পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ১০ অক্টোবর ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটে নূর মোহাম্মদ একটি সূত্রের মাধ্যমে প্রশ্নপত্রের অস্পষ্ট ছবি পান। পরে সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে জাহাঙ্গীর তাঁকে প্রশ্নপত্রের স্পষ্ট ছবি পাঠান।
এরপর নূর মোহাম্মদ প্রশ্নের উত্তর প্রস্তুত করে জাহাঙ্গীর ও ইমদাদুলকে পাঠান। পরে চক্রের সদস্য ও তাঁদের সঙ্গে যুক্ত পরীক্ষার্থীদের কাছে প্রশ্নপত্র ও উত্তর পৌঁছে দেওয়া হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এ কাজে আসাদুল, রুবেল, মফিজুল ও সুজন যুক্ত ছিলেন বলে জানান তিনি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, চক্রটি হোয়াটসঅ্যাপে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে এ ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করত।
প্রশ্নপত্রের মূল উৎস এখনো শনাক্ত হয়নি
প্রশ্নপত্রের মূল উৎস সম্পর্কে এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক বলেন, নূর মোহাম্মদকে প্রশ্নপত্র কে দিয়েছিল, তা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নূর মোহাম্মদ ও জাহাঙ্গীর দাবি করেছেন, তাঁরা ফেসবুকের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র পেয়েছেন। তবে তাঁদের দেওয়া তথ্য এখনো নির্ভরযোগ্য বলে মনে করছে না তদন্ত দল। সংশ্লিষ্ট ফেসবুক গ্রুপ ও আইডি যাচাই করা হচ্ছে।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী এ ঘটনায় জড়িত কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত ওই অধিদপ্তরের কারও সম্পৃক্ততার সরাসরি তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে অন্য সরকারি দপ্তরের কর্মচারীদের জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তে আরও তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
জব্দ ৪৮ পাতার ব্যাংক চেকসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে ১০০ টাকার ১১৬টি ও ৫০ টাকার চারটি স্ট্যাম্প, এক সেট প্রশ্নপত্র, বিভিন্ন পরীক্ষার প্রবেশপত্রের ১৯ পাতা, ১০টি সনদপত্র, বিভিন্ন ব্যাংকের চেকের ৪৮ পাতা ও একটি ব্যাংক চেক, আটটি মোবাইল ফোন, বিভিন্ন ক্যাটাগরির আরও ১৫টি সনদপত্র, ছয়টি জাতীয় পরিচয়পত্র এবং নগদ চার হাজার টাকা জব্দ করা হয়েছে।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন আরও জানান, চক্রের এক সদস্যের কাছ থেকে প্রতারিত হওয়ার পর মফিজুল ইসলাম বেশি অর্থ উপার্জনের আশায় চক্রটির সঙ্গে যুক্ত হন বলে তদন্তে জানা গেছে। এ ছাড়া ভর্তি-বাণিজ্যসংক্রান্ত অর্থ লেনদেনের তথ্যও পাওয়া গেছে।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের মূল উৎস শনাক্ত এবং এ ঘটনায় জড়িত অন্যদের খুঁজে বের করতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি।
এফএইচ/বিএ/পিআর