ঢাকা, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
১২ কার্তিক, ১৪৩৩

/ Breaking News

বাবাকে বাঁচানোর আকুতি জানিয়ে শেষ বার্তা, ধানক্ষেতে মিলল তাজমিনের মরদেহ

কুমিল্লা সংবাদদাতা

প্রকাশিত: ১১:৫৩, ৯ অক্টোবর ২০২৬

বাবাকে বাঁচানোর আকুতি জানিয়ে শেষ বার্তা, ধানক্ষেতে মিলল তাজমিনের মরদেহ

বাবার কাছে মুঠোফোনে বার্তা পাঠিয়ে আটকে রাখার কথা জানিয়েছিল কিশোরী জান্নাতুল তাজমিন। উদ্ধারের আকুতিও জানিয়েছিল। কিন্তু সেই বার্তা যখন বাবার চোখে পড়ে, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। চার দিন নিখোঁজ থাকার পর কুমিল্লার লালমাইয়ে একটি ফসলি জমি থেকে উদ্ধার হয় সপ্তম শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর মরদেহ। এ ঘটনায় প্রধান সন্দেহভাজন সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমনকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) চট্টগ্রাম থেকে সুমনকে গ্রেপ্তারের তথ্য নিশ্চিত করেন কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান। পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডে আর কেউ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে তাজমিনের ব্যবহৃত মুঠোফোনটি এখনো উদ্ধার করা যায়নি।

বান্ধবীর বাড়িতে যাওয়ার কথা বলে বের হয়েছিল তাজমিন

নিহত জান্নাতুল তাজমিন (১৫) যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা এলাকার আবদুল আলীমের মেয়ে। পরিবারের সঙ্গে সে কুমিল্লা নগরের রেসকোর্স এলাকার একটি ভাড়া বাসায় থাকত। পড়ত নগরের ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণিতে।

পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাড়িতে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়েছিল তাজমিন। এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। স্বজনেরা অপেক্ষায় ছিলেন—হয়তো ফিরে আসবে তাদের আদরের মেয়েটি। কিন্তু চার দিন পর সেই অপেক্ষার অবসান হয় এক হৃদয়বিদারক খবরে।

গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকাল ৮টার দিকে লালমাই উপজেলার পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগতপুর উত্তরপাড়ার মানুমুড়া জঙ্গলসংলগ্ন একটি ফসলি জমি থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার গলায় গামছা পেঁচানো ছিল।

বাবার ফোনে এসেছিল উদ্ধারের আকুতি

তদন্তের মধ্যে সবচেয়ে মর্মান্তিক তথ্য হয়ে উঠেছে বাবার কাছে পাঠানো তাজমিনের শেষ দিকের বার্তাগুলো। তার বাবা আবদুল আলীম সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, বুধবার গভীর রাতে মেয়ে মুঠোফোনে বার্তা ও লাইভ লোকেশন পাঠিয়ে তাকে আটকে রাখার কথা জানায় এবং উদ্ধারের অনুরোধ করে। তবে তখন তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। ভোরে বার্তা দেখে মেয়ের পাঠানো লোকেশন অনুসরণ করে সেখানে যান। পরে জানতে পারেন, মেয়েকে আর জীবিত পাওয়া যাবে না।

একজন বাবার কাছে সন্তানের বিপদের বার্তা পাওয়ার পরও তাকে উদ্ধার করতে না পারার এই ঘটনা স্বজনদের শোককে আরও ভারী করে তুলেছে।

কললিস্ট ও সিসিটিভি ফুটেজে চলাচলের সূত্র

পুলিশ জানায়, তদন্তে তাজমিনের মুঠোফোনের কললিস্ট, অন্যান্য তথ্য এবং বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ৪ অক্টোবর সে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যায়। পরদিন ৫ অক্টোবর কুমিল্লায় ফিরে ভোররাতে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হয়।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ৭ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে রওনা হয়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে নূরজাহান হোটেলের সামনে নামে তাজমিন। সিসিটিভি ফুটেজে তাকে একটি গাড়ি থেকে একা নামতে দেখা যায়। আশপাশের কয়েকটি ক্যামেরায় মুঠোফোন হাতে ও কাঁধে ব্যাগ নিয়ে তাকে চলাচল করতেও দেখা গেছে। পরে সড়কের দিকে চলে যাওয়ার পর আর তার চলাচল ক্যামেরায় ধরা পড়েনি।

অটোরিকশার সূত্র ধরে সুমনকে শনাক্ত

মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাস্থল থেকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা জব্দ করে পুলিশ। গাড়িটির নিবন্ধনের সূত্র ধরে মালিককে শনাক্ত করা হয়। বৃহস্পতিবার রাতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি জানান, অটোরিকশাটি ভাড়ায় চালাতেন সুমন। এরপর সুমনকে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করে তার খোঁজে অভিযান চালায় পুলিশ।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, সুমনের বাড়ি চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলায়। কয়েক বছর আগে বিয়ের পর তিনি লালমাই উপজেলার জয়নগর গ্রামে ঘরজামাই হিসেবে বসবাস শুরু করেন। পারিবারিক বিরোধের জেরে প্রায় এক মাস আগে শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে চলে যান বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

মোবাইল ফোন উদ্ধার হয়নি, তদন্ত চলছে

তাজমিনের মরদেহ উদ্ধারের পর তার বাবা অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে লালমাই থানায় হত্যা মামলা করেন। ময়নাতদন্ত শেষে স্বজনেরা মরদেহ বাড়িতে নিয়ে যান।

কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. লুৎফর রহমান জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার সুমনকে কুমিল্লায় আনা হচ্ছে। এ ঘটনায় তিনি একাই জড়িত, নাকি অন্য কেউও জড়িত, তা জিজ্ঞাসাবাদের পর বিস্তারিত জানানো হবে।

একটি কিশোরীর নিখোঁজ হওয়া, বাবার কাছে পাঠানো উদ্ধারের আকুতি এবং শেষ পর্যন্ত ফসলি জমিতে তার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় শোক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—তাজমিনের সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছিল, তার মুঠোফোন কোথায় এবং এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত কি না। এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে পুলিশের তদন্ত ও গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে আছেন স্বজনেরা।

এফএইচ/বিএ/পিআর

সর্বোচ্চ পঠিত - Breaking News

আপনার জন্য নির্বাচিত