ঢাকা, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
১২ কার্তিক, ১৪৩৩

/ Breaking News

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হয়নি, সরকারকে হিসাব দিতে হবে: মঞ্জু

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৯:০৯, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হয়নি, সরকারকে হিসাব দিতে হবে: মঞ্জু
জুলাই সনদের একটি অক্ষরও বাস্তবায়ন করা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু। তিনি বলেছেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করলে সরকারকে জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার দায়ে একদিন রাজনৈতিক ও আইনগত বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।

বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘বছর পেরিয়ে জুলাই সনদ: প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা’ শীর্ষক সুধীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

মঞ্জু বলেন, জুলাই সনদের ৫ হাজার ৬৯০ শব্দের মধ্যে বর্তমান সরকার কতটুকু বাস্তবায়ন করেছে, তার হিসাব জনগণ জানতে চায়। গণভোটের রায় অমান্য করা হলে সরকারকে এর জবাবদিহি করতে হবে।

সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এমনভাবে প্রতিবাদ করতে হবে, যাতে তা একদিকে কুসুম-কুসুম বিরোধিতা বলে মনে না হয়, অন্যদিকে সরকারি দলের নেতা-কর্মীদের গালাগালি, হামলা কিংবা ক্রসফায়ারের হুমকির মুখেও পড়তে না হয়। কী ধরনের ভাষা বা কর্মসূচি নিলে কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করেও এমন পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব, তা জানা থাকলে সংশ্লিষ্টদের জানানোর আহ্বান জানান তিনি।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে জনগণের রায় অস্বীকার করার পরিণতিতে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল উল্লেখ করে মঞ্জু বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করলে বর্তমান সরকারও ইতিহাসে জুলফিকার আলী ভুট্টো ও ইয়াহিয়া খানের মতো নেতিবাচক চরিত্র হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তাঁর ভাষ্য, ভবিষ্যতের গণঅভ্যুত্থানও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী বা সরকারকে কটূক্তির অভিযোগে গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গ তুলে তিনি প্রশ্ন করেন, একই ধরনের অভিযোগে অন্যদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে বরাদ্দসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

‘সরকার উল্টো পথে হাঁটছে’

সভায় বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, সরকার উল্টো পথে হাঁটছে এবং দেশে বাক্‌স্বাধীনতা হরণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। মেজর আক্তারুজ্জামানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী মামলা দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

দিলারা চৌধুরী বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না করে সংবিধান সংশোধনী কমিটি গঠন করা হয়েছে। সংসদে সরকারি ও বিরোধী দল উভয়ই সরকারের অংশ। বিরোধী দল কঠোর অবস্থান নিলে সরকার আরও আগ্রাসী হয়ে উঠতে পারে—এমন আশঙ্কায় তারা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।

আইজিপির আইনবিরোধী বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও ওই বক্তব্যের সাফাই গাইছেন। বিরোধী দল কেবল পাঁচ বছর পর ক্ষমতায় আসার অপেক্ষায় থেকে কুসুম-কুসুম বিরোধিতা করলে তা ভুল সিদ্ধান্ত হবে।

উচ্চকক্ষের মেয়াদ ছয় বছর করার প্রস্তাবের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এ ধরনের ব্যবস্থা ভবিষ্যৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে পক্ষপাতদুষ্ট করে তোলার আশঙ্কা তৈরি করতে পারে, যা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করবে।

‘সংস্কার বাস্তবায়ন না করলে বাড়বে রাজনৈতিক সংকট’

ভয়েস অব রিফর্মের সংগঠক মাশরুর ফাহিম দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে ‘বানরের তৈলাক্ত বাঁশে ওঠার’ সঙ্গে তুলনা করেন। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানকে জনযুদ্ধ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেই জনযুদ্ধে জনগণ বিজয়ী হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও সাইবার সুরক্ষার মতো বিষয় নিয়ে নতুন করে বিতর্ক না বাড়িয়ে সংস্কার বাস্তবায়নে এগিয়ে যেতে হবে।

সাইবার আইন প্রণয়নের আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্যের কারণে গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটছে উল্লেখ করে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, আইনটি কার্যকর হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। সরকার সীমারেখা অতিক্রম করে ফ্যাসিবাদের দিকে ধাবিত হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মাশরুর ফাহিম বলেন, পিএসসি, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মতো সংস্কার সাধারণ মানুষের স্বার্থেই প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের বাইরে থেকেও ভবিষ্যতে আরেকটি গণঅভ্যুত্থান ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, জুলাই সনদের কথা বললেই সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়, জনগণ সনদটি বোঝে না। অথচ জনগণ বিচার ও সংস্কার চায়। সরকার চাইলেও কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা ক্রসফায়ারের অনুমতি দিতে পারে না।

অতীতের ক্রসফায়ার ও গুমের ঘটনা দেশের মানুষকে গভীরভাবে ক্ষতবিক্ষত করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি নিশ্চিত করতেই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন জরুরি। জুলাই গণহত্যার বিচারপ্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ছে বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।

ফুয়াদ আরও বলেন, সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সংকট কাটানো, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কারের জন্য জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে মীমাংসিত বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করা উচিত নয়। গুম, মানবাধিকার ও সাইবার আইনসংক্রান্ত উদ্যোগের বড় ভুক্তভোগীদের মধ্যে বিএনপিও রয়েছে। অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি না করে সরকারকে প্রতিশ্রুতি রক্ষা এবং জনগণের সঙ্গে করা অঙ্গীকার পূরণের আহ্বান জানান তিনি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে বিতর্কের সমালোচনা

এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার তুষার বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্যের কারণে গ্রেপ্তারের ঘটনা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে, যা অতীতের রাজনৈতিক সংকটের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।

বিচারপতিদের অবসরের বয়স বাড়ানোকে কেন্দ্র করে অতীতে সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেই সংকটের পরিণতি শুধু রাজনৈতিক দলগুলোকে নয়, পুরো জাতিকে ভোগ করতে হয়েছে। জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির বক্তব্য ও বাস্তব অবস্থানের মধ্যে অসংগতি রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে কোনো কুমতলব থাকলে তা সফল হবে না বলে সতর্ক করেন সরোয়ার তুষার।

মানবাধিকারকর্মী ও কলামিস্ট আমাতুল্লাহ রুবী বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছিল। গণভোটে জনগণ সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। সেই রায় উপেক্ষা করা হলে তা গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী হবে।

তিনি বলেন, অর্থনৈতিক সংকট ও বিনিয়োগে অনাগ্রহের পেছনে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং কার্যকর সংস্কারের অভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অর্থবহ সংস্কার ছাড়া অর্থনীতিতে অগ্রগতি সম্ভব নয়। সংস্কার ছাড়া নির্বাচন হলে দেশ আরও পিছিয়ে পড়বে।

সভায় আরও বক্তব্য দেন এবি যুব পার্টির সদস্যসচিব হাদীউজ্জামান খোকন, ছাত্রপক্ষের সভাপতি মোহাম্মদ প্রিন্স এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ এবি পার্টির আহ্বায়ক আব্দুল হালিম খোকন।

এ সময় এবি পার্টির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন স্বেচ্ছাসেবক পার্টির আহ্বায়ক কেফায়েত হোসাইন তানভীর, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্যসচিব বারকাজ নাসির আহমদ, ছাত্রপক্ষের সাধারণ সম্পাদক রাফিউর রহমান ফাত্তাহ, সহকারী প্রচার সম্পাদক আজাদুল ইসলাম আজাদ, রিপন মাহমুদ, সহকারী অর্থ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক, নারী উন্নয়নবিষয়ক সহসম্পাদক শাহিনুর আক্তার শিলা, উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থানবিষয়ক সহসম্পাদক সুমাইয়া শারমিন ফারহানা, সহকারী দপ্তর সম্পাদক মশিউর রহমান মিলু, মোহসীনুল হক চৌধুরী, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আবু রাইয়ান আশয়ারী রছী এবং হাতিরঝিল থানার আহ্বায়ক রিয়াজ উদ্দিনসহ অন্য নেতারা।

এফএইচ/বিএ/পিআর

সর্বোচ্চ পঠিত - Breaking News

আপনার জন্য নির্বাচিত