ঢাকা, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
১২ কার্তিক, ১৪৩৩

/ Breaking News

দেশের ৪৭ শতাংশের বেশি পরিবার ঋণগ্রস্ত, আয় ছাড়িয়েছে ব্যয়

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০:৩৫, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

দেশের ৪৭ শতাংশের বেশি পরিবার ঋণগ্রস্ত, আয় ছাড়িয়েছে ব্যয়

নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপে দেশের প্রায় অর্ধেক পরিবার ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক বিশেষ জরিপ অনুযায়ী, জাতীয় পর্যায়ে ৪৭ দশমিক ৪২ শতাংশ পরিবার দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে ঋণ করতে বাধ্য হচ্ছে। শহরের তুলনায় গ্রামীণ পরিবারগুলোর মধ্যে ঋণগ্রস্ত হওয়ার হার বেশি।

জাতীয় বেতন কমিশনের অনুরোধে বিবিএসের ‘দারিদ্র্য ও জীবিকা পরিসংখ্যান সেল’ পরিচালিত ‘লিভিং স্ট্যান্ডার্ড সার্ভে ২০২৫’ শীর্ষক জরিপে এ চিত্র উঠে এসেছে।

জরিপের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে গ্রামের ৫১ দশমিক ৯১ শতাংশ পরিবার ঋণ নিয়েছে। শহরাঞ্চলে এ হার ৪০ দশমিক ১৯ শতাংশ। আর সিটি করপোরেশন এলাকায় ঋণগ্রস্ত পরিবারের হার ৩২ দশমিক ১১ শতাংশ।

আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি

জরিপে দেখা গেছে, দেশে পরিবারপ্রতি মাসিক গড় আয় ৩৩ হাজার ৫১৩ টাকা। বিপরীতে গড় মাসিক ব্যয় ৩৫ হাজার ৩১১ টাকা। অর্থাৎ গড়ে প্রতি মাসে আয়ের চেয়ে ১ হাজার ৭৯৮ টাকা বেশি খরচ করতে হচ্ছে পরিবারগুলোকে।

ব্যয়ের ক্ষেত্রে অঞ্চলভেদে বড় পার্থক্য রয়েছে। সিটি করপোরেশন এলাকায় পরিবারপ্রতি মাসিক গড় ব্যয় ৪৬ হাজার ৭৭৮ টাকা। অন্যান্য শহরাঞ্চলে তা ৩৭ হাজার ৩৪৪ টাকা এবং গ্রামীণ এলাকায় ৩২ হাজার ৫৩২ টাকা।

খাতভিত্তিক হিসাবে জাতীয় পর্যায়ে পরিবারের মোট ব্যয়ের প্রায় অর্ধেক খাদ্যপণ্যে এবং বাকি অর্ধেক খাদ্যবহির্ভূত খাতে ব্যয় হয়। তবে সিটি করপোরেশন এলাকায় মোট ব্যয়ের ৫৬ দশমিক ৭ শতাংশই চলে যায় খাদ্যবহির্ভূত খাতে।

বিবিএসের ২০২২ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপের সঙ্গে তুলনা করলে পরিস্থিতির পরিবর্তন স্পষ্ট হয়। ওই জরিপে পরিবারপ্রতি মাসিক গড় আয় ছিল ৩২ হাজার ৪২২ টাকা এবং ব্যয় ছিল ৩১ হাজার ৫০০ টাকা। তখন আয়ের তুলনায় ব্যয় কম থাকলেও নতুন জরিপে ব্যয় আয়কে ছাড়িয়ে গেছে।

কেন বাড়ছে ঋণের চাপ

নবম জাতীয় বেতন স্কেলের আওতায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ প্রণয়নে সহায়তার জন্য এ জরিপ পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত বছরের ১৪ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের ১৫০টি নমুনা এলাকা থেকে ৩ হাজার পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এ কাজে আধুনিক ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া, কর্মসংস্থানে স্থবিরতা এবং প্রকৃত মজুরি হ্রাস সাধারণ মানুষকে ঋণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

তিনি উল্লেখ করেন, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা ৫৬ মাস মজুরি বৃদ্ধির হারের চেয়ে মূল্যস্ফীতির হার বেশি ছিল। ফলে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ার কারণে নয়, বরং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দামের কারণে পরিবারের ব্যয়ের চাপ বেড়েছে।

জাহিদ হোসেন আরও বলেন, শহরের তুলনায় গ্রামে কাজের সুযোগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বৈচিত্র্য কম থাকায় সেখানে ঋণগ্রস্ত পরিবারের হার বেশি। গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রবাসী আয় ভূমিকা রাখলেও তা সীমিতসংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছায়। ফলে অনেক পরিবার পুরোনো সঞ্চয় ভেঙে কিংবা ধারদেনা করে দৈনন্দিন চাহিদা মেটাচ্ছে।

দারিদ্র্য বাড়ার আশঙ্কা

বিবিএসের জরিপের চিত্রের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক পূর্বাভাসেরও মিল রয়েছে। গত ৬ অক্টোবর প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’-এ বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক চাপ, কর্মসংস্থানের ঘাটতি ও দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির কারণে দেশে দারিদ্র্যের হার বাড়তে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা বেড়ে প্রায় ২২ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া জ্বালানি সংকট ও শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে গেলে সাধারণ মানুষের আর্থিক সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, পরিবারের আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান কমাতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি এবং প্রকৃত মজুরি বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে ঋণনির্ভরতা আরও বাড়তে পারে।

এফএইচ/বিএ/পিআর

সর্বোচ্চ পঠিত - Breaking News

আপনার জন্য নির্বাচিত