ঢাকা, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
১২ কার্তিক, ১৪৩৩

/ Breaking News

আজ পৃথিবীর মন খারাপ, ফুটবলের কবি মেসির বিদায়

ক্রীড়া ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১:৫৪, ৭ অক্টোবর ২০২৬

আজ পৃথিবীর মন খারাপ, ফুটবলের কবি মেসির বিদায়

কিছু বিদায় শুধু একজন মানুষকে নয়, একটি প্রজন্মের স্মৃতিকেও নাড়িয়ে দেয়। লিওনেল মেসির বিদায়ও তেমনই। আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সিতে তাঁর শেষ ম্যাচ শেষ হওয়ার পর যেন মন খারাপের ছায়া নেমেছে বিশ্বজুড়ে। যে বাঁ পায়ের জাদুতে কোটি মানুষ রাত জেগেছে, চিৎকার করেছে, কেঁদেছে, আনন্দে ভেসেছে—সেই জাদুকর এবার জাতীয় দলের জার্সি তুলে রাখলেন।

মেসির শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ ছিল বেনিনের বিপক্ষে। বুয়েনস এইরেসের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে ৮৫ হাজারের বেশি দর্শকের সামনে ৩-০ গোলের জয় দিয়ে আর্জেন্টিনার হয়ে শেষবার মাঠ ছাড়েন তিনি। বিদায়ী ম্যাচেও নিজের স্বভাবসুলভ ছাপ রেখে গেছেন—একটি গোলের পাশাপাশি সতীর্থদের দুটি গোলে অবদান রেখেছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।

কিন্তু ম্যাচের ফল নয়, সেদিনের সবচেয়ে বড় গল্প ছিল মেসির চোখের জল।

মাঠে নামার আগেই আবেগে ভেঙে পড়েন তিনি। জাতীয় সংগীতের সময়ও চোখে পানি ধরে রাখতে পারেননি। পাশে ছিলেন তাঁর তিন সন্তান। গ্যালারিতে ছিলেন পরিবারের সদস্যরা। মাঠে রাখা হয়েছিল বিশাল আর্জেন্টিনা জার্সি, যেখানে ছিল ১০ নম্বরের সঙ্গে লেখা—‘Gracias’, অর্থাৎ ধন্যবাদ।

ম্যাচ শেষে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে মেসি যেন নিজের জীবনেরই একটি অধ্যায়ের শেষ পাতা লিখলেন। ২১ বছর আর্জেন্টিনার জার্সি পরার পর বিদায়ের এই মুহূর্তকে তিনি বর্ণনা করেন ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কষ্টের দিনগুলোর একটি হিসেবে। জাতীয় দলের হয়ে আর মাঠে না নামার কষ্টের কথাও জানান তিনি।

মেসির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটা কেবল ফুটবল দেখার সম্পর্ক নয়। তাঁর খেলা দেখতে গিয়ে কত কৈশোর কেটেছে রাত জেগে, কত বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছে, কত তর্ক হয়েছে—তার হিসাব নেই। পরীক্ষার আগের রাতেও অনেকে মেসির খেলা দেখেছে। সকালে ঘুমজড়ানো চোখে বন্ধুর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে আগের রাতের ম্যাচ নিয়ে। সেই রাতগুলো যে একদিন শুধুই স্মৃতি হয়ে যাবে, তখন হয়তো কেউ ভাবেনি।

বার্সেলোনার জার্সিতে মেসিকে দেখার অভিজ্ঞতা ছিল অন্য রকম। বল তাঁর পায়ে গেলেই মনে হতো, এবার কিছু একটা ঘটবেই। কখনো ডিফেন্ডারদের ভিড় ভেঙে গোল, কখনো অবিশ্বাস্য ড্রিবলিং, আবার কখনো এমন একটি পাস—যেটি গোলের চেয়েও বেশি সুন্দর মনে হয়েছে। তাঁর ফুটবল তাই অনেকের কাছেই কেবল খেলা ছিল না; ছিল শিল্প।

আর্জেন্টিনার মেসির গল্পটা অবশ্য আরও আবেগের। একের পর এক ফাইনালে ব্যর্থতা, সমালোচনা, জাতীয় দল থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত—সবকিছুর মধ্য দিয়ে তাঁকে যেতে হয়েছে। কিন্তু ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা বদলে দেয় সেই গল্প। এরপর ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে হারিয়ে বহু বছরের স্বপ্ন পূরণ করেন মেসি। বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে তাঁর সেই ছবি হয়ে যায় ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় দৃশ্য।

এরপরও তাঁর পথচলা থামেনি। আর্জেন্টিনার হয়ে জিতেছেন আরও বড় বড় শিরোপা, গড়েছেন একের পর এক রেকর্ড। শেষ পর্যন্ত ২০৮তম আন্তর্জাতিক ম্যাচে এসে থামল সেই পথচলা। বেনিনের বিপক্ষে গোল করে জাতীয় দলের হয়ে তাঁর গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২৬-এ।

বিদায়ের মঞ্চে মেসি বলেছেন, আর্জেন্টিনার হয়ে খেলা তাঁর জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। তিনি জানিয়েছেন, সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত কষ্টের হলেও এখন সেটিই সঠিক সময় বলে মনে হয়েছে।

তবু প্রশ্ন থেকে যায়—মেসি কি সত্যিই চলে গেলেন?

আর্জেন্টিনার জার্সিতে হয়তো আর তাঁকে দেখা যাবে না। ম্যাচ শুরুর আগে আর সেই অপেক্ষা থাকবে না—‘আজ মেসি কী করবেন?’ বল পায়ে নিলে গ্যালারিতে যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ত, সেটিও হয়তো আর ফিরবে না।

কিন্তু মেসিকে কি ফুটবল থেকে মুছে ফেলা যায়?

কোনো এক গভীর রাতে ইউটিউবে পুরোনো ম্যাচ চালু হলে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর কোনো গোলের ভিডিও সামনে এলে কিংবা ২০১৪, ২০১৮ বা ২০২২-এর কোনো ম্যাচের স্মৃতি ফিরে এলে আবারও থমকে যাবে পৃথিবী।

মেসি তখন আর শুধু একজন ফুটবলার থাকবেন না। তিনি হয়ে থাকবেন একটি প্রজন্মের কৈশোর, তারুণ্য, বন্ধুত্ব, রাতজাগা আর অসংখ্য আনন্দ-বেদনার স্মৃতি।

জাতীয় দলের জার্সি হয়তো খুলে রেখেছেন ফুটবলের এই কবি। কিন্তু কোটি মানুষের হৃদয় থেকে তাঁকে বিদায় দেওয়া সম্ভব নয়।

মেসি বিদায় নিয়েছেন আর্জেন্টিনা থেকে, ফুটবল থেকে নয়—আর মানুষের হৃদয় থেকে তো কখনোই নয়।

এফএইচ/বিএ/পিআর

সর্বোচ্চ পঠিত - Breaking News

আপনার জন্য নির্বাচিত