ঢাকা, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
১২ কার্তিক, ১৪৩৩

/ Breaking News

লুভরের রহস্যময় জগতে এক দুপুর, মোনালিসার হাসিতে থমকে গেল সময়

ভ্রমণ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১:০৬, ২ অক্টোবর ২০২৬

লুভরের রহস্যময় জগতে এক দুপুর, মোনালিসার হাসিতে থমকে গেল সময়

প্যারিস—নামটি উচ্চারণ করলেই যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে প্রেম, শিল্প আর ইতিহাসের এক মোহময় শহর। আর সেই শহরের প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত জাদুঘর লুভর। বিশাল এই স্থাপনার প্রতিটি দেয়াল, করিডোর আর শিল্পকর্ম যেন কয়েক শতাব্দীর ইতিহাসের গল্প বলে।

প্যারিসের মেট্রো ধরে, কখনও হেঁটে, অবশেষে পৌঁছানো গেল লুভরের কাচের পিরামিডের সামনে। আধুনিক স্থাপত্যের এই পিরামিডের সঙ্গে প্রাচীন প্রাসাদের বিশালতা মিলে তৈরি করেছে এক অনন্য দৃশ্য। পিরামিডের নিচের প্রবেশপথ দিয়ে ভেতরে ঢোকার মুহূর্তেই মনে হয়, যেন বর্তমান ছেড়ে অতীতের কোনো সুড়ঙ্গপথে পা রাখা হলো।

দুর্গ থেকে বিশ্বখ্যাত জাদুঘর

লুভরের ইতিহাসও এর শিল্পকর্মের মতোই বিস্ময়কর। ১১৯০ সালে রাজা ফিলিপ অগাস্টাস প্যারিসকে বহিরাগত আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য এখানে একটি সামরিক দুর্গ নির্মাণ করেন। পরে ১৫৪৬ সালে রাজা ফ্রাঁসোয়া প্রথম সেই দুর্গকে রাজপ্রাসাদে রূপান্তর করেন এবং শিল্পকর্ম সংগ্রহের উদ্যোগ নেন।

পরবর্তী সময়ে লুভর ধীরে ধীরে শিল্প ও সংস্কৃতির অন্যতম বড় সংগ্রহশালায় পরিণত হয়। ১৭৯৩ সালে ফরাসি বিপ্লবের সময় এটি সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। তখন সংগ্রহে ছিল প্রায় ৫০০টি শিল্পকর্ম। বর্তমানে লুভরের সংগ্রহ কয়েক দশ হাজার শিল্পকর্মে বিস্তৃত।

মোনালিসার সামনে থমকে থাকা

লুভরের ভেতরে প্রবেশ করলেই চারপাশে চোখে পড়ে ছবি, ভাস্কর্য, দেয়ালচিত্র ও নানা সভ্যতার নিদর্শন। মিসরের প্রাচীন নিদর্শন থেকে গ্রিক ভাস্কর্য, রেনেসাঁর চিত্রকর্ম থেকে ইসলামী শিল্প—পৃথিবীর বিভিন্ন সময় ও অঞ্চলের শিল্প যেন একই ছাদের নিচে এসে মিলেছে।

তবে এতসব শিল্পকর্মের ভিড়েও দর্শনার্থীদের বড় আকর্ষণ লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ‘মোনালিসা’।

ছবিটির সামনে দাঁড়িয়ে সেই বিখ্যাত হাসির দিকে তাকালে সময়ের হিসাব যেন হারিয়ে যায়। শত শত বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও একটি ছোট ক্যানভাস কীভাবে অসংখ্য মানুষকে থমকে দিতে পারে, মোনালিসার সামনে দাঁড়ালে সেই প্রশ্নই মনে আসে।

ভাঙা হাতেও অমর সৌন্দর্য

মোনালিসার পর দর্শনার্থীর চোখ আটকে যায় আরেক বিখ্যাত শিল্পকর্মে—‘ভেনাস দে মিলো’। গ্রিক দেবী অ্যাফ্রোদিতির এই বিখ্যাত ভাস্কর্যের দুই হাত নেই। তবুও এর সৌন্দর্য ও ভঙ্গিমা দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।

সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে আছে ‘উইংড ভিক্টরি অব সামোথ্রেস’। ডানাওয়ালা এই ভাস্কর্যকে মনে হয় যেন মুহূর্তের মধ্যেই সামনে এগিয়ে আসছে। পাথরের তৈরি একটি ভাস্কর্য কীভাবে গতিশীলতার অনুভূতি তৈরি করতে পারে, সেটিও এখানে এসে অনুভব করা যায়।

মমি থেকে নেপোলিয়নের মুকুট

লুভরের আরেক অংশে রয়েছে প্রাচীন মিসরের নানা নিদর্শন। মমি, শবাধার ও স্ফিংক্সের মতো প্রত্নসম্পদ দর্শনার্থীকে নিয়ে যায় হাজার বছর আগের এক পৃথিবীতে।

অন্যদিকে জ্যাক-লুই ডেভিডের বিশাল ক্যানভাস ‘দ্য করোনেশন অব নেপোলিয়ন’ ইতিহাসকে যেন জীবন্ত করে তোলে। ছবির প্রতিটি চরিত্র, পোশাক ও অভিব্যক্তিতে ফুটে উঠেছে একটি বিশেষ সময়ের রাজনৈতিক ও রাজকীয় আবহ।

স্থাপত্যও যেন একেকটি শিল্পকর্ম

লুভরের আকর্ষণ শুধু এর সংগ্রহে সীমাবদ্ধ নয়। বিশাল প্রাসাদের দেয়াল, উঁচু ছাদ, অলংকৃত করিডোর এবং ধ্রুপদি স্থাপত্য দর্শনার্থীদের আলাদা এক অভিজ্ঞতা দেয়।

একটি করিডোর পেরোতে পেরোতেই মনে হয় ইতিহাসের অন্য একটি অধ্যায়ে পৌঁছে যাওয়া গেছে। কোথাও যুদ্ধের দৃশ্য, কোথাও মানুষের আবেগ, কোথাও শিল্পীর কল্পনা—সব মিলিয়ে লুভর যেন একটি বিশাল জীবন্ত ইতিহাসগ্রন্থ।

শিল্পের কাছে ফিরে আসা

লুভরের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়, মানুষ তার সময়, অনুভূতি ও বিশ্বাসকে শিল্পের মাধ্যমে ভবিষ্যতের জন্য রেখে গেছে। গুহাচিত্র থেকে শুরু করে রেনেসাঁর চিত্রকর্ম—প্রতিটি শিল্পকর্মের মধ্যেই লুকিয়ে আছে মানুষের জীবন ও সভ্যতার গল্প।

এত ইতিহাস আর সৌন্দর্যের মাঝে দাঁড়িয়ে একটি প্রশ্নও মনে জাগে—আমরা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কী রেখে যাচ্ছি?

তবে সেই প্রশ্নের উত্তরও যেন লুভরের দর্শনার্থীদের ভিড়ের মধ্যেই পাওয়া যায়। শত শত বছর পরও মানুষ শিল্প দেখতে ছুটে আসছে। অর্থাৎ শিল্পের প্রতি মানুষের আকর্ষণ এখনও শেষ হয়ে যায়নি।

সন্ধ্যায় পিরামিডের নিচে

ফেরার সময় আবার দাঁড়ানো হলো লুভরের কাচের পিরামিডের নিচে। প্যারিসে তখন সন্ধ্যা নামছে। চারপাশে জ্বলে উঠেছে নরম আলো। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ নীরবে বসে আছেন, কেউবা প্রিয়জনের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন।

পেছনে তাকালে মনে হয়, লুভর হয়তো একজন দর্শনার্থীর কথা মনে রাখবে না। কিন্তু একজন দর্শনার্থী লুভরে কাটানো সেই সময় সহজে ভুলতে পারবেন না।

কারণ লুভর শুধু একটি জাদুঘর নয়—এটি মানুষের শিল্পবোধ, ইতিহাস, কল্পনা ও আবেগের দীর্ঘ যাত্রার এক বিশাল সাক্ষ্য। শিল্পের সঙ্গে একবার হৃদয়ের সম্পর্ক তৈরি হলে, সেই অভিজ্ঞতা সঙ্গে করেই ফিরে আসতে হয়।

এফএইচ/বিএ/পিআর

সর্বোচ্চ পঠিত - Breaking News

আপনার জন্য নির্বাচিত