চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি বসানোর দৌড়, মুখোমুখি যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া-চীন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০২:৫৫, ৪ অক্টোবর ২০২৬
চাঁদের মাটিতে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের প্রতিযোগিতায় নেমেছে বিশ্বের পরাশক্তিগুলো। যুক্তরাষ্ট্র ২০৩০ সালের মধ্যেই চাঁদে একটি পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের লক্ষ্য নিয়েছে। অন্যদিকে চীন-রাশিয়া জোটের পরিকল্পনা রয়েছে ২০৩৬ সালের মধ্যে সেখানে একটি পারমাণবিক চুল্লি চালু করার।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত আগস্টের শেষ দিকে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ঠিকাদারদের একটি পারমাণবিক চুল্লি তৈরির প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিয়েছে। চুল্লিটি মহাকাশযাত্রার ধকল সহ্য করার পাশাপাশি চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে দীর্ঘ সময় রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই কাজ করতে সক্ষম হবে বলে পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
নাসার এই তৎপরতার পেছনে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে চীন ও রাশিয়ার মহাকাশ উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে। চীনের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে রাশিয়া ২০৩৬ সালের মধ্যে চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি চালুর পরিকল্পনা করছে। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বীদের আগে চাঁদের মাটিতে নিজেদের প্রযুক্তি স্থাপন করতে সময় এগিয়ে এনেছে যুক্তরাষ্ট্র।
চাঁদে ঘাঁটি গড়ার লড়াই
যুক্তরাষ্ট্র ও চীন—দুই দেশই চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি গড়ার পরিকল্পনা করছে। চাঁদের বরফ ও পানির মতো সম্পদ কাজে লাগানো এবং সেখান থেকে সৌরজগতের আরও গভীরে অভিযান চালানো তাদের অন্যতম লক্ষ্য।
এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি অভিযানের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ চাঁদের কিছু অঞ্চলে দীর্ঘ সময় সূর্যের আলো পাওয়া যায় না। পারমাণবিক চুল্লি সূর্যালোকের ওপর নির্ভরশীল নয় এবং তুলনামূলক ছোট আকারেও তৈরি করা সম্ভব।
নাসার পরিকল্পিত ‘লুনার রিঅ্যাক্টর ১’ থেকে প্রায় ২০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। এই পরিমাণ বিদ্যুৎ যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১৬টি বাড়ির চাহিদা মেটাতে পারে।
রাশিয়া-চীনের ‘সেলেনা’
চীনের নেতৃত্বাধীন চন্দ্রঘাঁটিতে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য রাশিয়া ‘সেলেনা’ নামের একটি পারমাণবিক চুল্লি তৈরির পরিকল্পনা করছে। এটি সর্বোচ্চ ১০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে এবং প্রায় এক দশক স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করতে পারবে বলে পরিকল্পনা করা হয়েছে।
চন্দ্রাভিযানে রাশিয়ার দীর্ঘ অভিজ্ঞতাও রয়েছে। দেশটি অতীতে কক্ষপথে ৩০টিরও বেশি পারমাণবিক চুল্লি পাঠিয়েছে, যার বেশিরভাগই ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল।
রাশিয়ার পারমাণবিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কুরচাতভ ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট মিখাইল কোভালচুক বলেছেন, মহাকাশে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহারিক ক্ষেত্রে মস্কোর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই।
যুক্তরাষ্ট্রও পিছিয়ে থাকতে চায় না
মহাকাশে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারে যুক্তরাষ্ট্রের আগের অভিজ্ঞতা থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে নতুন কোনো চুল্লি স্থাপন করতে পারেনি নাসা। ১৯৬৫ সালে একটি পারমাণবিক চুল্লি উৎক্ষেপণ করেছিল সংস্থাটি। পরে অন্য একটি মহাকাশযানের ব্যর্থতার পর সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এরপর মহাকাশভিত্তিক পারমাণবিক কর্মসূচিতে যুক্তরাষ্ট্র ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করলেও চাঁদের মাটিতে নতুন কোনো চুল্লি স্থাপন সম্ভব হয়নি।
এবার নাসা ২০৩০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন চুল্লি উৎক্ষেপণের জন্য প্রস্তুত করতে চায়। ২০২৮ সালের ডিসেম্বরে মঙ্গলগামী একটি মহাকাশযান পাঠানোর পরিকল্পনাতেও পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের কথা রয়েছে। পাশাপাশি হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, পৃথিবীর কক্ষপথ ও চাঁদে ব্যবহারের জন্য পেন্টাগনও নিজস্ব মহাকাশ চুল্লি তৈরির পরিকল্পনা করছে।
তাড়াহুড়ো নিয়ে বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ
তবে চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি পাঠানোর এই প্রতিযোগিতা নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, উৎক্ষেপণ বা অবতরণের সময় দুর্ঘটনা ঘটলে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
চুল্লি চাঁদে পৌঁছানোর আগে নিষ্ক্রিয় রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে পৃথিবীতে উৎক্ষেপণের সময় দুর্ঘটনা ঘটলেও ঝুঁকি তুলনামূলক কম থাকবে বলে পারমাণবিক প্রকৌশলীরা মনে করছেন। কিন্তু রকেট বিস্ফোরণ, ভুল অবতরণ কিংবা চুল্লি ক্ষতিগ্রস্ত হলে তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ইউনিয়ন অব কনসার্নড সায়েন্টিস্টসের পারমাণবিক বিদ্যুৎ নিরাপত্তা বিভাগের পরিচালক এডউইন লিম্যান সতর্ক করে বলেছেন, মহাকাশ প্রতিযোগিতার সঙ্গে পারমাণবিক শক্তি যুক্ত হলে সম্ভাব্য ঝুঁকিও বেড়ে যেতে পারে।
দুর্ঘটনা হলে ‘নো-গো জোন’?
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, চাঁদের পৃষ্ঠে কোনো চুল্লিতে বড় ধরনের বিস্ফোরণ বা মেল্টডাউন হলে সংশ্লিষ্ট এলাকা দীর্ঘ সময়ের জন্য মানুষের প্রবেশের অনুপযোগী হয়ে যেতে পারে।
অতীতের কিছু ঘটনা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ২০১৯ সালে রাশিয়ায় একটি চুল্লিচালিত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দুর্ঘটনার ঘটনায় পারমাণবিক প্রতিক্রিয়ার দাবি উঠেছিল। ঘটনায় অন্তত পাঁচজন কর্মী নিহত হন বলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে রাশিয়া ওই ক্ষেপণাস্ত্র চুল্লিচালিত ছিল—এমন দাবি অস্বীকার করেছিল।
জাতিসংঘের মহাকাশে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহারবিষয়ক একটি ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রধান লিওপোল্ড সুমারারও উৎক্ষেপণের মুহূর্তকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়গুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
শেষ পর্যন্ত কে এগিয়ে যাবে?
যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের পরিকল্পনা নিয়ে প্রযুক্তিগত নথি, কেনাকাটার তথ্য, একাডেমিক গবেষণা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার বিশ্লেষণ করে চাঁদের পারমাণবিক প্রতিযোগিতার একটি চিত্র উঠে এসেছে।
তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ এরই মধ্যে কয়েক দফা সময়সূচি পিছিয়েছে। চাঁদের দুর্গম ও অমসৃণ পৃষ্ঠে ভারী ও তেজস্ক্রিয় সরঞ্জাম নিরাপদে নামানোর সক্ষমতাও এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।
হংকং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির পারমাণবিক বিজ্ঞানী জুলিয়েন ডি ট্রোলিউড ডি ল্যানভারসিনের ভাষায়, “এই মুহূর্তে কোনো কিছুই নিশ্চিত নয়।”
তবু চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের দৌড় থামছে না। মহাকাশ গবেষণার পাশাপাশি এটি এখন পরাশক্তিগুলোর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, কৌশলগত প্রভাব ও মহাকাশে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতারও নতুন মঞ্চ হয়ে উঠছে।
সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস
এফএইচ/বিএ/পিআর