ফিটনেসের মেয়াদ শেষ, তবু সড়কে বাস—নাটোরে প্রাণ গেল ১৪ জনের
নাটোর সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৮:৩৪, ২০ অক্টোবর ২০২৬
নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়ায় যাত্রীবাহী বাস ও বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ গেছে ১৪ জনের। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৩০ জন। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে নাটোর-পাবনা মহাসড়কের সরকারপাড়া এলাকায় বনপাড়া পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের সামনে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনায় দুমড়েমুচড়ে যায় যান দুটি। স্বজন হারানোর শোকে ভারী হয়ে ওঠে ঘটনাস্থল ও আশপাশের পরিবেশ।
এদিকে দুর্ঘটনাকবলিত আরপি পরিবহনের বাসটির ফিটনেস সনদের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল বলে প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন।
যেভাবে ঘটল দুর্ঘটনা
পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, পটুয়াখালীর কুয়াকাটা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী আরপি পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের তীব্রতায় বাস ও ট্রাকের সামনের অংশ দুমড়েমুচড়ে যায়।
দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান নয়জন। পরে আহতদের হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়। ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট উদ্ধারকাজে অংশ নেয়। আহতদের উদ্ধার করে স্থানীয় বিভিন্ন ক্লিনিক, বড়াইগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, নাটোর সদর হাসপাতাল ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
শনাক্ত হয়েছে কয়েকজনের পরিচয়
নিহতদের মধ্যে শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার সামাদ (৭০), সোহাগ হোসেন (৩০), জুয়েল রানা (৪০), শালাল মোল্লা (৪৫), শাহিন হোসেন (২৫), কাশেম (৩৫) ও জহুর উদ্দিনের পরিচয় পাওয়া গেছে। এ ছাড়া রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ফরহাদপুর গ্রামের বাসচালক সোহেল রানা (৪০), বাগমারার আনোয়ার হক (৩০) এবং পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জের শিশু তাছফিয়া খাতুনের (৮) পরিচয় শনাক্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। নিহতদের পরিচয়ের তালিকা ও সংখ্যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
বাসটির ফিটনেসের মেয়াদ শেষ হয়েছিল
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, দুর্ঘটনাকবলিত বাসটির ফিটনেস সনদের মেয়াদ ২০২৬ সালের ১৩ মে শেষ হয়। তবে বাসটির রুট পারমিটের মেয়াদ ২০২৮ সালের ১৩ মে পর্যন্ত রয়েছে। ফিটনেস সনদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও বাসটি কীভাবে সড়কে চলাচল করছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, মহাসড়কে অন্য যানবাহনকে ওভারটেক করার সময় বাসটির সঙ্গে ট্রাকের সংঘর্ষ হয়ে থাকতে পারে। তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। এ বিষয়ে তদন্তের পর বিস্তারিত জানা যাবে।
সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি
দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবুল হায়াতের নেতৃত্বে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে নাটোর জেলা প্রশাসন। কমিটিকে দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন জেলা প্রশাসক সুমনী আক্তার ও পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক। নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন জেলা প্রশাসক। পাশাপাশি ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ প্রশাসন।
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন
ভোরের এই দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনায় নাটোর-পাবনা মহাসড়কে যানবাহনের নিরাপত্তা ও ফিটনেসবিহীন গাড়ির চলাচল নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট যানবাহনের কাগজপত্র, চালকদের দায়িত্ব এবং সড়কে চলাচলের নিরাপত্তাব্যবস্থা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নিহতদের পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। আহতদের দ্রুত সুস্থতা এবং দুর্ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এফএইচ/বিএ/পিআর