ঢাকা, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
১২ কার্তিক, ১৪৩৩

/ Breaking News

মঙ্গলের উপগ্রহ ফোবোস থেকে নমুনা আনতে জাপানের ঐতিহাসিক মহাকাশ অভিযান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৯:২৩, ২০ অক্টোবর ২০২৬

মঙ্গলের উপগ্রহ ফোবোস থেকে নমুনা আনতে জাপানের ঐতিহাসিক মহাকাশ অভিযান
মঙ্গলের উপগ্রহ ফোবোস থেকে মাটি ও পাথরের নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ঐতিহাসিক মহাকাশ অভিযান শুরু করেছে জাপান। বিজ্ঞানীদের আশা, এই অভিযানে সংগৃহীত নমুনা বিশ্লেষণের মাধ্যমে মঙ্গলের দুই উপগ্রহের উৎপত্তি, সৌরজগতের গঠন এবং প্রাণের উৎপত্তি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে।

জাপানের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা জাক্সা জানিয়েছে, দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তানেগাশিমা মহাকাশকেন্দ্র থেকে স্থানীয় সময় ভোর ৪টা ৪১ মিনিটে এইচ-৩ রকেটের মাধ্যমে ‘মার্শিয়ান মুনস এক্সপ্লোরেশন’ (এমএমএক্স) মহাকাশযানটি উৎক্ষেপণ করা হয়। উৎক্ষেপণের প্রায় এক ঘণ্টা পর রকেট থেকে মহাকাশযানটি বিচ্ছিন্ন হলে অভিযান শুরুর সাফল্য নিশ্চিত করেন বিজ্ঞানীরা।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, মহাকাশযানটি ২০২৭ সালের আগস্টে মঙ্গলের কক্ষপথে পৌঁছাবে। এরপর মঙ্গলের দুটি উপগ্রহের বড়টি ফোবোসের পৃষ্ঠে গিয়ে অন্তত ১০ গ্রাম মাটি ও পাথরের নমুনা সংগ্রহ করবে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০৩১ সালে নমুনাসহ পৃথিবীতে ফিরবে মহাকাশযানটি।

ফোবোসে নামবে রোভার

প্রায় পাঁচ বছর মেয়াদি এ অভিযানে পাঁচটি মহাকাশ সংস্থা একসঙ্গে কাজ করছে। প্রায় ৫৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার ব্যয়ের এই প্রকল্পে পাঁচ টন ওজনের মহাকাশযান ব্যবহার করা হচ্ছে। ফোবোসে নমুনা সংগ্রহের আগে সেখানে পাঠানো হবে একটি রোবোটিক অনুসন্ধানযান ও একটি রোভার।

মঙ্গলের কক্ষপথে পৌঁছানোর পর মহাকাশযানটি ফোবোসের কক্ষপথের সঙ্গে নিজের অবস্থান সমন্বয় করবে। এরপর মহাকাশযান থেকে বিচ্ছিন্ন হবে ফরাসি-জার্মান নির্মিত ছোট রোভার ‘ইডেফিক্স’। ‘অ্যাস্টেরিক্স’ কমিকসের সাদা টেরিয়ার চরিত্রের নামে রোভারটির নাম রাখা হয়েছে।

ফোবোসের মাধ্যাকর্ষণ পৃথিবীর তুলনায় অত্যন্ত দুর্বল। এ কারণে চার চাকার রোভারটি উপগ্রহটির পৃষ্ঠে চলার সময় কয়েকবার লাফিয়ে এগিয়ে যেতে পারে। সেখানে প্রায় ১০০ দিন ধরে অনুসন্ধান চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে এর। মূল মহাকাশযানের নিরাপদ অবতরণ এবং নমুনা সংগ্রহের উপযুক্ত স্থান চিহ্নিত করাই হবে রোভারটির অন্যতম প্রধান কাজ।

এরপর চার পা-যুক্ত অবতরণযানটি ফোবোসের পৃষ্ঠে নামবে। সেখানে মাত্র দুই ঘণ্টা অবস্থান করে খননযন্ত্র ও শোষণপ্রযুক্তির সাহায্যে মাটি ও পাথরের নমুনা সংগ্রহ করবে। কাজ শেষে নমুনা নিয়ে আবার মহাকাশে ফিরে যাবে এটি।

প্রথমবারের মতো ছোট উপগ্রহ থেকে নমুনা সংগ্রহ

মঙ্গলে একাধিক মহাকাশযান পাঠানো হলেও এর কোনো উপগ্রহে অবতরণ করে নমুনা সংগ্রহের চেষ্টা আগে হয়নি। ফলে জাপানের এই অভিযান মহাকাশ গবেষণায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।

অভিযানে যুক্ত নাসার জ্যোতির্পদার্থবিদ টম স্ট্যাটলার বলেন, এ উদ্যোগকে ঘিরে বিজ্ঞানীদের মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনা ও বিস্ময় কাজ করছে। জার্মান মহাকাশ সংস্থার রোভারবিষয়ক প্রধান মার্কুস গ্রেবেনস্টাইনও এটিকে জীবনে একবার পাওয়া যায়—এমন সুযোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

ফোবোস ছাড়াও অভিযানের অংশ হিসেবে মঙ্গলের অপর উপগ্রহ ডেইমোস পর্যবেক্ষণ করা হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের নভেম্বরে মহাকাশযানটি মঙ্গলের কক্ষপথ ত্যাগ করবে।

উপগ্রহ দুটির উৎপত্তি নিয়ে নতুন তথ্যের আশা

মঙ্গলের উপগ্রহ ফোবোস ও ডেইমোস কীভাবে তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে দুটি প্রধান তত্ত্ব রয়েছে।

প্রথম তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো বড় মহাজাগতিক বস্তু মঙ্গলে আঘাত হানার পর ছিটকে বেরিয়ে আসা পদার্থ থেকে উপগ্রহ দুটির সৃষ্টি হয়েছে। অন্য তত্ত্বে বলা হয়, ফোবোস ও ডেইমোস মূলত গ্রহাণু। মঙ্গলের মহাকর্ষীয় আকর্ষণে এগুলো গ্রহটির কক্ষপথে আটকা পড়েছে।

জাপানের মহাকাশ গবেষণা সংস্থার আশা, ফোবোস থেকে সংগৃহীত নমুনা বিশ্লেষণ করে এই দুই তত্ত্বের মধ্যে কোনটি সঠিক, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে সূর্যের কাছাকাছি অবস্থিত পাথুরে গ্রহগুলোতে প্রাণের উপযোগী পরিবেশ কীভাবে তৈরি হয়েছে, তা বুঝতেও গবেষণাটি সহায়ক হতে পারে।

এ অভিযানের ফলাফল ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে আরও উন্নত অনুসন্ধান এবং মানুষবাহী মহাকাশ অভিযানের পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছে নাসা।

মঙ্গলের নমুনা ফেরাতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা

মঙ্গল গ্রহ থেকে সরাসরি পাথর ও মাটির নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টাও চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার ‘পারসিভিয়ারেন্স’ রোভার ২০২১ সাল থেকে মঙ্গলে অনুসন্ধান চালিয়ে নমুনা সংগ্রহ করছে। তবে সেগুলো পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে, চীন ২০২৮ সালের দিকে ‘তিয়ানওয়েন-৩’ মহাকাশযান উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা করেছে। লক্ষ্য হলো ২০৩১ সালের মধ্যে মঙ্গলের নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা।

পরিকল্পনা সফল হলে চীনের অভিযান জাপানের এমএমএক্স মিশনের আগেই নমুনা নিয়ে পৃথিবীতে ফিরতে পারে। তবে দুই দেশের অভিযানের লক্ষ্য এক নয়। চীন সরাসরি মঙ্গল গ্রহের পৃষ্ঠ থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে চায়, আর জাপানের অভিযান পরিচালিত হবে মঙ্গলের উপগ্রহ ফোবোসকে কেন্দ্র করে।

দুটি অভিযানই সফল হলে মঙ্গলব্যবস্থার গঠন, গ্রহ ও উপগ্রহের বিবর্তন এবং সৌরজগতের প্রাথমিক ইতিহাস সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের জ্ঞান আরও সমৃদ্ধ হবে।

এফএইচ/বিএ/পিআর

সর্বোচ্চ পঠিত - Breaking News

আপনার জন্য নির্বাচিত