ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
১৩ কার্তিক, ১৪৩৩

/ বিনোদন

রাজ্জাক-শাবানা জুটি নিয়ে কবরীর মনে জমেছিল আক্ষেপ!

বিনোদন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০:৪১, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

রাজ্জাক-শাবানা জুটি নিয়ে কবরীর মনে জমেছিল আক্ষেপ!
ঢাকাই চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নায়করাজ রাজ্জাক ও কবরী ছিলেন দর্শকের ভালোবাসায় গড়া এক অনন্য জুটি। পর্দায় তাঁদের রসায়ন, চোখের ভাষা আর অভিনয়ের মুগ্ধতা একসময় দর্শককে টেনেছে সিনেমা হলে। তাঁদের জুটিকে অনেকে কলকাতার কিংবদন্তি উত্তম কুমার–সুচিত্রা সেনের সঙ্গেও তুলনা করতেন। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই জনপ্রিয় জুটি ভেঙে যায়। রাজ্জাক জুটি বাঁধেন শাবানার সঙ্গে, আর কবরী অভিনয় করেন আলমগীর ও ফারুকের বিপরীতে।

পর্দার সেই জুটি ভেঙে যাওয়ার পেছনে কী ছিল? রাজ্জাক–শাবানার জুটিকে কেন সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি কবরী? মৃত্যুর আগে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের মনের কষ্টের কথা অকপটে জানিয়েছিলেন ঢাকাই সিনেমার এই ‘মিষ্টি মেয়ে’।

‘তাদের জুটিতে একটা পলিটিক্স ছিল’

শাহরিয়ার নাজিম জয়ের উপস্থাপনায় ‘সেন্স অব হিউমার’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাজ্জাক–শাবানার জুটি নিয়ে নিজের অনুভূতির কথা বলেছিলেন কবরী।

তাঁর ভাষ্য ছিল, “রাজ্জাক-শাবানার জুটি যদি স্বাভাবিকভাবে হতো, তাহলে আমি কিছু মনে করতাম না। কিন্তু তাদের জুটিতে একটা পলিটিক্স ছিল। এটি আমাকে কষ্ট দিয়েছে।”

কবরীর এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছিল, সহশিল্পীর সঙ্গে নতুন জুটি গড়া নিয়ে তাঁর আপত্তি ছিল না; বরং সেই জুটি গড়ে ওঠার পেছনের পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর মনে আক্ষেপ ছিল। তবে ‘পলিটিক্স’ বলতে তিনি ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছিলেন, সে বিষয়ে সাক্ষাৎকারে তাঁর বক্তব্যের বাইরে নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না।

সাক্ষাৎকারে রাজ্জাকের সঙ্গে শাবানার অভিনীত সিনেমাগুলো নিয়েও নিজের মূল্যায়ন তুলে ধরেছিলেন কবরী। তাঁর মতে, ওই সিনেমাগুলোতে শাবানার চেয়ে তিনি নিজে আরও ভালো অভিনয় করতে পারতেন।

রাজ্জাক–কবরী: যে জুটি ছিল দর্শকের হৃদয়ে

১৯৬০-এর দশকের শেষভাগে রাজ্জাক ও কবরী একসঙ্গে অভিনয় শুরু করেন। ১৯৬৮ সালে মুক্তি পাওয়া ‘আবির্ভাব’সহ বিভিন্ন সিনেমার মধ্য দিয়ে তাঁদের জুটি দর্শকের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরে ‘ময়নামতি’, ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘দীপ নেভে নাই’, ‘স্মৃতিটুকু থাক’, ‘রংবাজ’ ও ‘গুন্ডা’র মতো সিনেমায় তাঁদের অভিনয় দর্শকের মনে জায়গা করে নেয়।

এই জুটির জনপ্রিয়তার বড় কারণ ছিল পর্দায় তাঁদের স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয় ও বিশ্বাসযোগ্য রসায়ন। প্রেম, অভিমান, বিরহ কিংবা পারিবারিক টানাপোড়েন—বিভিন্ন আবেগের গল্পে তাঁদের অভিনয় দর্শকের কাছে আলাদা আবেদন তৈরি করেছিল।

কবরী এক সাক্ষাৎকারে তাঁদের জনপ্রিয়তার প্রসঙ্গে বলেছিলেন, তাঁরা অভিনয়ের প্রতি নিবেদিত ছিলেন এবং পর্দায় মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষের অনুভূতি তুলে ধরতে পেরেছিলেন। দর্শকের সঙ্গে তাঁদের সেই সংযোগই জুটিটিকে দীর্ঘদিন স্মরণীয় করে রেখেছে। 

জুটি ভাঙার পরও থেমে থাকেননি কবরী

রাজ্জাকের সঙ্গে জুটি ভেঙে যাওয়ার পর কবরীর অভিনয়জীবন থেমে থাকেনি। বরং নতুন সহশিল্পীদের সঙ্গে কাজ করে নিজের অবস্থান আরও দৃঢ় করেন তিনি।

কবরী নিজেই জানিয়েছিলেন, একই সময়ে আলমগীরের সঙ্গে ‘লাভ ইন সিমলা’ এবং ফারুকের সঙ্গে ‘সুজন সখী’ সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছিলেন। বিশেষ করে ‘সুজন সখী’ ফারুক–কবরী জুটির অন্যতম স্মরণীয় কাজ হিসেবে পরিচিত। সিনেমাটির গান ও গ্রামীণ প্রেমের গল্পও দর্শকের মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখেছে। 

অন্যদিকে, রাজ্জাকও শাবানার সঙ্গে জুটি বেঁধে একাধিক জনপ্রিয় সিনেমায় অভিনয় করেন। ‘মধুমিলন’, ‘অবুঝ মন’, ‘মাটির ঘর’ ও ‘দুই পয়সার আলতা’র মতো সিনেমায় তাঁদের জুটি দর্শকের প্রশংসা পায়। 

অর্থাৎ, রাজ্জাক–কবরী জুটির অবসানের পর দুজনই নিজেদের অভিনয়জীবনে নতুন অধ্যায় তৈরি করেছিলেন। তবে পুরোনো জুটিকে ঘিরে দর্শকের আবেগ আর স্মৃতির জায়গাটি আলাদা ছিল।

শাবানার অভিনয় নিয়েও মন্তব্য করেছিলেন কবরী

একই সাক্ষাৎকারে শাবানার অভিনয় সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে কবরী বলেছিলেন, শাবানার সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর রয়েছে। পরিচালকদের কাছ থেকেও তিনি শুনেছেন, শাবানার পক্ষে নিজের পরিচিত অভিনয়ধারা থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হতো।

কবরীর এই মন্তব্যও ছিল তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও মূল্যায়নের অংশ। শাবানা নিজেও বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে দীর্ঘ ও সফল অভিনয়জীবন গড়েছেন। রাজ্জাকের পাশাপাশি আলমগীরসহ একাধিক নায়কের সঙ্গে তাঁর জুটি দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছিল। 

স্মৃতিতে কবরী, আলোচনায় রাজ্জাক–শাবানা

২০২১ সালের ১৭ এপ্রিল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান কবরী। তাঁর মৃত্যুর পাঁচ বছরেরও বেশি সময় পর পুরোনো সাক্ষাৎকারের বক্তব্য নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সেই বক্তব্যে যেমন ছিল সহশিল্পীর সঙ্গে জুটি ভাঙার কষ্ট, তেমনি ছিল নিজের অভিনয়ক্ষমতা নিয়ে আত্মবিশ্বাস ও চলচ্চিত্রজগতের অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেওয়া আক্ষেপ।

রাজ্জাক ও কবরী—দুজনই এখন প্রয়াত। নায়করাজ রাজ্জাক ২০১৭ সালের ২১ আগস্ট মারা যান। তাঁদের একসঙ্গে অভিনীত সিনেমাগুলো এখনো বাংলা চলচ্চিত্রের স্মরণীয় অধ্যায়। 

সময় বদলেছে, চলচ্চিত্রের ধরন বদলেছে, বদলেছে দর্শকের রুচিও। কিন্তু রাজ্জাক–কবরীর পর্দার রসায়ন আজও নস্টালজিয়ায় ফিরিয়ে নেয় পুরোনো দিনের দর্শকদের। আর কবরীর সেই শেষদিকের সাক্ষাৎকার মনে করিয়ে দেয়—পর্দায় জনপ্রিয়তার ঝলমলে আলো থাকলেও, তার আড়ালে শিল্পীদের ব্যক্তিগত অভিমান ও না-বলা কষ্টও থেকে যেতে পারে।

এফএইচ/বিএ/পিআর

সর্বোচ্চ পঠিত - বিনোদন

আপনার জন্য নির্বাচিত