ঢাকা, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
১২ কার্তিক, ১৪৩৩

/ Breaking News

সিঁদুর খেলা, অঞ্জলি আর বিসর্জনের বিষাদে বিদায় নিচ্ছেন দেবী দুর্গা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৮:১০, ২১ অক্টোবর ২০২৬

সিঁদুর খেলা, অঞ্জলি আর বিসর্জনের বিষাদে বিদায় নিচ্ছেন দেবী দুর্গা

সিঁদুর খেলা, শেষ অঞ্জলি, শঙ্খধ্বনি আর ঢাকের বাদ্যের মধ্য দিয়ে আজ বুধবার (২১ অক্টোবর) বিজয়া দশমীতে শেষ হচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। পাঁচ দিনের পূজা-অর্চনা ও আনন্দ-উৎসব শেষে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানাচ্ছেন ভক্তরা। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন পূজামণ্ডপে সকাল থেকেই বিরাজ করছে ভক্তি, আনন্দ ও বিদায়ের বিষাদমাখা পরিবেশ।

বুধবার সকাল থেকে ঢাকার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে দশমীর বিহিত পূজা, দর্পণ বিসর্জন ও শেষ পুষ্পাঞ্জলি অর্পণের আনুষ্ঠানিকতা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর শুরু হয় দেবী বরণ ও সিঁদুর খেলা। লাল-সাদা শাড়িতে সজ্জিত নারীদের পদচারণা, ঢাকের তালে নাচ-গান এবং উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে মণ্ডপগুলো।

দশমীর অন্যতম আকর্ষণ সিঁদুর খেলায় বিবাহিত নারীরা দেবী দুর্গার চরণে সিঁদুর নিবেদন করেন। পরে একে অপরের কপাল ও গালে সিঁদুর মাখিয়ে স্বামীর দীর্ঘায়ু, পরিবারের সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করেন। দেবীকে বিদায় জানানোর বেদনা ভুলে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন তারা। অবিবাহিত তরুণ-তরুণীসহ বিভিন্ন বয়সী দর্শনার্থীরাও মণ্ডপে উপস্থিত হয়ে উৎসবে শামিল হন।

ঢাকেশ্বরী মন্দিরে ভক্তদের ভিড়

রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে সকাল থেকেই ভক্তদের ব্যাপক সমাগম দেখা যায়। দশমীর পূজা ও দর্পণ বিসর্জনের আনুষ্ঠানিকতা শেষে দেবী বরণ ও সিঁদুর খেলায় অংশ নেন নারীরা। লাল-সাদা পোশাকে সজ্জিত ভক্তদের উপস্থিতিতে মন্দির প্রাঙ্গণে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।

পূজা দিতে আসা এক তরুণী জানান, বিয়ের পর নারীরা সিঁথিতে সিঁদুর ধারণের মাধ্যমে স্বামীর মঙ্গল কামনা করেন। অবিবাহিত নারীরাও ভবিষ্যৎ জীবনে সুখী দাম্পত্যের প্রত্যাশা নিয়ে এ উৎসব দেখতে ও অংশ নিতে মণ্ডপে আসেন।

অন্যদিকে, ঢাকার বিভিন্ন মণ্ডপে ভক্তরা দেবীর চরণে শেষ অঞ্জলি দিয়ে প্রার্থনা করেন, মা দুর্গা যেন সব অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটিয়ে পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন।

বনানী ও রমনায় সিঁদুর খেলা

রাজধানীর বনানীর কামাল আতাতুর্ক পার্কে গুলশান-বনানী পূজামণ্ডপেও দেবীকে বরণ করতে জড়ো হন শত শত নারী। সিঁদুর, পান, ফুল ও মিষ্টি দিয়ে সাজানো বরণের থালা হাতে একে একে দেবীর কাছে যান তারা। দেবীর মুখে মিষ্টি ছোঁয়ানো ও সিঁদুর নিবেদনের পর পরস্পরকে সিঁদুর মাখিয়ে দেন। ঢাকের বাদ্য ও উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো মণ্ডপ।

গুলশান-বনানী পূজামণ্ডপের প্রধান পুরোহিত সুনীল চক্রবর্তী জানান, সকালে দশমীর বিহিত পূজার মাধ্যমে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। পূজা শেষে দর্পণ বিসর্জন ও দেবীর চরণে শেষ পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করা হয়। পরে প্রথা অনুযায়ী দেবী বরণ ও সিঁদুর খেলার আয়োজন করা হয়।

রমনা কালী মন্দিরেও সকাল থেকে ভক্তদের ভিড় দেখা যায়। একদিকে দেবীর বিদায়ী আরতি ও শেষ অঞ্জলি, অন্যদিকে মন্দির প্রাঙ্গণে নাচ-গানে মেতে ওঠেন দর্শনার্থীরা। নারী-পুরুষের পাশাপাশি তরুণ ও শিশুরাও উৎসবে অংশ নেয়।

স্বামীর সঙ্গে মন্দিরে আসা ভক্ত অনিন্দিতা দেবনাথ বলেন, সবার সুস্থতা ও মঙ্গল কামনায় তিনি দেবীর কাছে প্রার্থনা করেছেন। প্রতি বছর সিঁদুর খেলার আনন্দ ভাগ করে নিতে মন্দিরে আসেন বলেও জানান তিনি।

বন্ধুদের সঙ্গে উৎসবে অংশ নেওয়া তরুণ অর্ঘ্য রায় বলেন, দেবীর বিদায়ে মন খারাপ হলেও আগামী বছর আবারও মা দুর্গা ফিরে আসবেন—এই বিশ্বাস থেকেই আনন্দের মধ্য দিয়ে বিদায়কে স্মরণীয় করে রাখার চেষ্টা করেন তারা।

বিসর্জনের প্রস্তুতি, নিরাপত্তায় গুরুত্ব

পূজার শেষ দিনের আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিভিন্ন মণ্ডপ থেকে প্রতিমা নিয়ে শোভাযাত্রা বের হওয়ার কথা রয়েছে। ঢাকা মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সহসভাপতি তাপস কুমার পাল জানান, নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সন্ধ্যার আগেই প্রতিমা বিসর্জনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের প্রতিমা নিয়ে বিকেল ৪টার দিকে শোভাযাত্রা শুরু হওয়ার কথা। শোভাযাত্রাটি পলাশী, জগন্নাথ হল, দোয়েল চত্বর, গুলিস্তান মোড়, নবাবপুর রোড ও রায়সাহেব বাজার হয়ে সদরঘাটের ওয়াইজঘাটে পৌঁছাবে। সেখানে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে রাজধানীর দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটবে।

উৎসবের শেষ দিনের আয়োজন নির্বিঘ্ন রাখতে পূজামণ্ডপ, শোভাযাত্রার পথ ও বিসর্জনস্থলে শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বিদায়ের বেদনায় আগামী বছরের অপেক্ষা

সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী দুর্গা অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠার বার্তা নিয়ে প্রতিবছর মর্ত্যে আগমন করেন। পূজা শেষে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে তাঁকে কৈলাসে ফিরিয়ে দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা এবং ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত চলে দুর্গোৎসবের মূল আয়োজন।

বিজয়া দশমী শুধু বিদায়ের দিন নয়, সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও শুভকামনা বিনিময়েরও উপলক্ষ। এদিন ছোটরা বড়দের প্রণাম করে আশীর্বাদ নেয়, সমবয়সীরা কোলাকুলি করে এবং মিষ্টিমুখের মাধ্যমে একে অপরকে বিজয়ার শুভেচ্ছা জানায়।

দেবীর বিদায়ে ভক্তদের মনে বিষাদের ছায়া নেমে এলেও মণ্ডপে মণ্ডপে শোনা যায় প্রত্যাশার সেই চিরচেনা ধ্বনি—‘আসছে বছর আবার হবে’। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব; নতুন করে অপেক্ষা শুরু হবে আগামী বছরের জন্য।

এফএইচ/বিএ/পিআর

সর্বোচ্চ পঠিত - Breaking News

আপনার জন্য নির্বাচিত