স্কুলের ছাদ ধসে ঝরল ২৮ প্রাণ, ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ল শিশুদের স্বপ্ন!
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৮:২০, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
সকালে বই-খাতা নিয়ে স্কুলে গিয়েছিল শিশুরা। কারও চোখে ছিল নতুন কিছু শেখার স্বপ্ন, কেউ হয়তো অপেক্ষায় ছিল বন্ধুদের সঙ্গে হাসি-আনন্দে সময় কাটানোর। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই সবকিছু বদলে গেল। শ্রেণিকক্ষের ওপর ধসে পড়ল ছাদ। বই-খাতার বদলে শিশুদের চাপা পড়তে হলো কংক্রিটের ধ্বংসস্তূপের নিচে। স্কুলের চেনা আঙিনায় নেমে এলো মৃত্যুর বিভীষিকা।
পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের রাজধানী পেশোয়ারে একটি বেসরকারি স্কুলের ছাদ ধসে অন্তত ২৮ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ২৭ জন শিক্ষার্থী ও একজন নারী শিক্ষক রয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১৯ জন। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও কয়েকজন আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) পেশোয়ারের আফ্রিদি আবাদ এলাকার আল খায়ের স্কুলে এ হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার সময় শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে ছিল। হঠাৎ ছাদ ধসে পড়ায় তারা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে।
ঘটনার পরপরই শুরু হয় উদ্ধার অভিযান। উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আটকে পড়াদের জীবিত উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে স্কুলের সামনে ও হাসপাতালে ভিড় করছেন স্বজনেরা। কারও চোখে সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আকুতি, কারও কণ্ঠে প্রিয়জনকে হারানোর আর্তনাদ।
সন্তান বেঁচে আছে কি না, সেই উৎকণ্ঠায় ছুটছেন বাবা-মা
স্কুলে ছাদ ধসের খবর ছড়িয়ে পড়তেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে অভিভাবকদের মধ্যে। কোন সন্তান বেঁচে আছে, কে কোথায় আটকে আছে—এমন অনিশ্চয়তায় ছোটাছুটি করতে থাকেন তাঁরা।
ডনের প্রতিবেদনে সামিউল্লাহ নামের এক অভিভাবকের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে তিনি দ্রুত স্কুলে ছুটে যান। সেখানে আট বছরের কম বয়সী তিনটি মেয়েশিশুকে উদ্ধার করেন তিনি।
সামিউল্লাহ জানান, সকাল ৮টা ৫০ মিনিটের দিকে বাড়ি থেকে ফোন পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হন। প্রায় ১০ মিনিট পর সেখানে পৌঁছান তিনি। তাঁর ছয় সন্তান ওই স্কুলে পড়াশোনা করে।
ভবনটির ধ্বংসস্তূপ দেখে প্রথমে তাঁর মনে হয়েছিল, নিচের শ্রেণিকক্ষে থাকা ছেলেটিও হয়তো আর বেঁচে নেই। কিন্তু পরে জানতে পারেন, পানি পান করতে শ্রেণিকক্ষ থেকে বের হওয়ায় ছেলেটি প্রাণে বেঁচে গেছে।
একজন বাবার কাছে এর চেয়ে বড় স্বস্তি আর কী হতে পারে! অথচ একই সময়ে কত পরিবার যে তাদের সন্তানকে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে, তার হিসাব তখনো নিশ্চিত ছিল না।
ধ্বংসস্তূপের নিচে উদ্ধারের অপেক্ষা
জরুরি উদ্ধারকারী সংস্থা রেসকিউ ১১২২-এর মুখপাত্র বিলাল আহমেদ ফয়জি জানিয়েছেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও কয়েকজন আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে তাদের বের করে আনার চেষ্টা করছেন।
আহতদের পেশোয়ারের লেডি রিডিং হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। হাসপাতালের মুখপাত্রের বরাতে ডন জানিয়েছে, আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। পরিস্থিতি সামাল দিতে হাসপাতালটিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়।
উদ্ধার অভিযান চলতে থাকায় হতাহতদের চূড়ান্ত সংখ্যা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে কেউ জীবিত আটকে আছেন কি না, সেই আশায় উদ্ধারকর্মীদের প্রতিটি মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কীভাবে ধসে পড়ল স্কুলের ছাদ?
পেশোয়ারের ডেপুটি কমিশনার আফাক ওয়াজির ডনকে জানিয়েছেন, আল খায়ের স্কুলের ছাদ ধসে শিক্ষার্থীরা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে। তাঁর দপ্তরের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনার সময় শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে অবস্থান করছিল।
কী কারণে ছাদটি ধসে পড়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। ভবনটির কাঠামোগত দুর্বলতা, নির্মাণমান কিংবা রক্ষণাবেক্ষণে কোনো ত্রুটি ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেখানে শিশুদের নিরাপদে বেড়ে ওঠার কথা, সেখানে এমন প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই ভবনের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
‘শিশুরা দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ’
এ মর্মান্তিক ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন খাইবার পাখতুনখোয়ার গভর্নর ফয়সাল করিম কুন্দি। তিনি নিহত শিশুদের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানের নির্দেশ দিয়েছেন।
পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, শিশুরা দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তাদের এমন মৃত্যু পুরো দেশের জন্যই এক ট্র্যাজেডি। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
দেশটির প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারিও গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, হৃদয়বিদারক এ ঘটনায় পুরো জাতি শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে। ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা ঠেকাতে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবনগুলো নিরাপত্তার মানদণ্ড মেনে নির্মিত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
পাকিস্তানে বারবার ভবন ধস, প্রশ্ন নিরাপত্তা নিয়ে
পাকিস্তানে ভবন ও ছাদ ধসের ঘটনা নতুন নয়। দুর্বল নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের কারণে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত জুলাইয়ে উমরকোটের কাছে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাইরের দেয়ালের একাংশ ধসে তিন মেয়েশিশু নিহত হয়। একই মাসে লাহোরের বাগবানপুরা এলাকায় নির্মাণাধীন একটি বেসরকারি স্কুল ভবনের ছাদ ধসে এক শিশু নিহত এবং অন্তত পাঁচজন আহত হয়।
এর আগে জুনে লাহোরের কাহনা এলাকায় একটি বেসরকারি কোচিং সেন্টারের ছাদ ধসে ১৪ শিশুর মৃত্যু হয়। এর দুই মাসেরও কম সময় আগে ডেরা গাজি খানের একটি বেসরকারি স্কুলের শ্রেণিকক্ষের ছাদ ধসে চার শিশু নিহত এবং ২০ জন আহত হয়েছিল।
একের পর এক এমন দুর্ঘটনা প্রশ্ন তুলছে—শিশুদের শিক্ষার জন্য নির্মিত ভবনগুলো কতটা নিরাপদ? ভবন নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, তা তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষ কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করছে?
পেশোয়ারের স্কুলটির ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া প্রাণগুলো শুধু কয়েকটি পরিবারের স্বপ্ন নয়, পুরো সমাজের জন্যই এক বেদনাদায়ক সতর্কবার্তা। একটি স্কুলের ছাদ ধসে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে পড়ে বহু পরিবারের ভবিষ্যৎ, থেমে যায় নিষ্পাপ শিশুদের পথচলা।
এখন সবার অপেক্ষা উদ্ধার অভিযানের পরবর্তী খবরের জন্য। আর এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর সবচেয়ে বড় দাবি—শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যাতে আর কোনো শিশুকে স্কুলে গিয়ে এমন মৃত্যুর মুখোমুখি হতে না হয়।
এফএইচ/বিএ/পিআর