ঢাকা, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
১২ কার্তিক, ১৪৩৩

/ Breaking News

সড়ক নির্মাণে গাফিলতি চলবে না, ৩ বছরের জামানতের আওতায় আসছেন ঠিকাদাররা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৮:৫৬, ২২ অক্টোবর ২০২৬

সড়ক নির্মাণে গাফিলতি চলবে না, ৩ বছরের জামানতের আওতায় আসছেন ঠিকাদাররা

নির্মাণের কয়েক মাস না যেতেই সড়কে গর্ত, উঠে যাচ্ছে পিচের আস্তরণ, সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হচ্ছে খানাখন্দ। কোথাও কোথাও একই সড়ক বারবার সংস্কার করতে গিয়ে ব্যয় হচ্ছে সরকারি অর্থ, বাড়ছে জনদুর্ভোগ। দীর্ঘদিনের এ সমস্যার সমাধানে সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারকাজে গুণগত মান, স্থায়িত্ব, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কঠোর অবস্থান নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে সড়ক নির্মাণের পর তিন বছরের ওয়ারেন্টি নিশ্চিত করতে ঠিকাদারদের কাছ থেকে জামানত গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ব্যবস্থা কার্যকর হলে নির্মাণকাজে ত্রুটি দেখা দিলে নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকেই তা মেরামতের দায়িত্ব নিতে হবে। এতে নিম্নমানের কাজের প্রবণতা কমার পাশাপাশি একই সড়কে বারবার সংস্কারের কারণে সরকারি অর্থের অপচয় নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। তবে প্রস্তাবিত ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করবে নীতিমালা, চুক্তির শর্ত, মাঠপর্যায়ের তদারকি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর।

বারবার সড়ক মেরামত, বাড়ছে সরকারি ব্যয়

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সড়ক ও মহাসড়কে নির্মাণ ও সংস্কারকাজের পর দ্রুত ক্ষয় দেখা দেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে অনেক সড়কে পিচ উঠে যাওয়া, ফাটল সৃষ্টি এবং ছোট গর্ত বড় আকার ধারণ করার ঘটনা ঘটে। এতে যান চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, বাড়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কা এবং দুর্ভোগে পড়েন যাত্রী ও চালকেরা।

একই সড়কে অল্প সময়ের ব্যবধানে একাধিকবার সংস্কারকাজ করতে হলে সরকারের ব্যয় যেমন বাড়ে, তেমনি সড়ক ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। নির্মাণসামগ্রীর মান, সঠিক নকশা, কাজের তদারকি এবং পানি নিষ্কাশনের দুর্বলতা—এসব বিষয় সড়কের স্থায়িত্ব কমিয়ে দিতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে শুধু নতুন সড়ক নির্মাণ নয়, নির্মাণের পর নির্ধারিত সময় পর্যন্ত সড়কের মান বজায় রাখার দায়িত্বও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ওপর কার্যকরভাবে আরোপের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

তিন বছরের ওয়ারেন্টি, ত্রুটি মেরামতের দায় ঠিকাদারের

প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় সড়ক নির্মাণের পর তিন বছরের ওয়ারেন্টির আওতায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজের ত্রুটি দেখা দিলে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে তা মেরামত করতে হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে জামানত গ্রহণ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নির্ধারিত শর্ত পূরণ না হলে জামানত ফেরত দেওয়ার বিষয়টি পর্যালোচনার সুযোগ থাকবে। এতে নির্মাণকাজ শেষ করে দ্রুত দায়মুক্ত হওয়ার প্রবণতা কমবে এবং কাজের মান নিশ্চিত করতে ঠিকাদারদের আরও সতর্ক হতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে তিন বছরের ওয়ারেন্টি ও জামানত ব্যবস্থার সুনির্দিষ্ট কাঠামো, জামানতের পরিমাণ, অর্থ ছাড়ের শর্ত এবং ত্রুটি নির্ধারণের পদ্ধতি সংশ্লিষ্ট নীতিমালা ও চুক্তির মাধ্যমে স্পষ্ট করা প্রয়োজন। পাশাপাশি স্বাভাবিক ব্যবহারজনিত ক্ষয়, অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ কিংবা পানি নিষ্কাশনের সমস্যার মতো বিষয়গুলোর দায় নির্ধারণেও কারিগরি মূল্যায়ন জরুরি।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা, কমিটির সুপারিশ

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি এ কে এম সেলিম রেজা হাবিবের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুসারে সড়ক ও রাস্তাঘাট নির্মাণকাজের গুণগত মান, স্থায়িত্ব, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিনি জানান, ঠিকাদারদের কাছ থেকে তিন বছরের ওয়ারেন্টি হিসেবে জামানত গ্রহণের সুপারিশ করেছে সংশ্লিষ্ট স্থায়ী কমিটি। পাশাপাশি নির্মাণকাজের তদারকি জোরদার এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

কমিটির এ সুপারিশ কার্যকর হলে নির্মাণকাজের মান যাচাই এবং ত্রুটি সংশোধনের ক্ষেত্রে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও বাস্তবায়নকারী সংস্থার দায়িত্ব আরও স্পষ্ট হতে পারে। তবে সুপারিশটি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বিধিবিধান, চুক্তির শর্ত এবং প্রশাসনিক নির্দেশনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

রাবারাইজড বিটুমিনে বাড়তে পারে সড়কের আয়ু

সড়কের স্থায়িত্ব বাড়াতে নির্মাণসামগ্রীর মান ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে রাবারাইজড বিটুমিন ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

রাবার মিশ্রিত বিটুমিন নির্দিষ্ট ধরনের সড়কে তাপমাত্রার পরিবর্তন ও যানবাহনের চাপজনিত ক্ষয় মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে। উপযুক্ত নকশা ও নির্মাণপদ্ধতির সঙ্গে এটি ব্যবহার করা গেলে কিছু ক্ষেত্রে ফাটল ও ক্ষয় কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করে স্থানীয় আবহাওয়া, যানবাহনের চাপ, উপকরণের মান এবং প্রকৌশলগত নকশার ওপর।

শুধু উন্নত বিটুমিন ব্যবহার করলেই সড়ক দীর্ঘস্থায়ী হবে না। সড়কের ভিত্তি মজবুত করা, মানসম্মত পাথর ও বালু ব্যবহার, সঠিকভাবে নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা এবং কার্যকর পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বর্ষায় সড়ক রক্ষায় চাই কার্যকর ড্রেনেজ

বাংলাদেশের আবহাওয়া ও ভৌগোলিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সড়কের নকশা প্রণয়ন করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘ সময় বৃষ্টির পানি জমে থাকলে এবং পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা দুর্বল হলে সড়কের ওপরের স্তর ও নিচের ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এ কারণে নির্মাণের শুরুতেই সড়কের উচ্চতা, পাশের নালা, পানি প্রবাহের পথ এবং প্রয়োজনীয় কালভার্টের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি অতিরিক্ত ভারবাহী যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দ্রুত মেরামতের ব্যবস্থাও কার্যকর করতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পনা ও নকশায় ত্রুটি থাকলে কিংবা নির্মাণের পর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ না হলে উন্নত উপকরণ ব্যবহার করেও কাঙ্ক্ষিত স্থায়িত্ব পাওয়া কঠিন।

তদারকিতে কঠোরতা, স্বচ্ছতায় জোর

সড়ক নির্মাণে অনিয়ম ও নিম্নমানের কাজ প্রতিরোধে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর তদারকি জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নির্মাণসামগ্রীর মান পরীক্ষার পাশাপাশি কাজের বিভিন্ন পর্যায়ে কারিগরি পরিদর্শন, পরীক্ষাগারের প্রতিবেদন সংরক্ষণ এবং চুক্তির শর্ত অনুসারে কাজ সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।

নির্মাণকাজে ত্রুটি শনাক্ত হলে বাস্তবায়নকারী সংস্থাকে তা লিখিতভাবে ঠিকাদারকে জানিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশোধনের ব্যবস্থা নিতে হবে। ওয়ারেন্টির মেয়াদ শেষে জামানত ফেরত দেওয়ার আগে চুক্তির শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা জরুরি।

এ ছাড়া দরপত্র প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, প্রকল্পের ব্যয় ও অগ্রগতির তথ্য প্রকাশ এবং অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের কার্যকর ব্যবস্থা থাকলে জবাবদিহি আরও শক্তিশালী হতে পারে।

বাস্তবায়নই এখন বড় পরীক্ষা

স্থপতি ইকবাল হাবিবের মতে, সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারকাজের গুণগত মান, স্থায়িত্ব, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে এ উদ্যোগের প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে চুক্তির শর্ত কতটা স্পষ্ট, তদারকি কতটা কার্যকর এবং অনিয়মের ক্ষেত্রে কতটা জবাবদিহি নিশ্চিত করা হচ্ছে, তার ওপর।

সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, তিন বছরের ওয়ারেন্টি ও জামানত ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে নিম্নমানের নির্মাণকাজের কারণে বারবার সড়ক সংস্কারের প্রবণতা কমতে পারে। এতে সরকারি অর্থের সাশ্রয়ের পাশাপাশি সড়কের নিরাপত্তা, স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে।

তবে শুধু জামানত গ্রহণ কিংবা নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। নির্মাণকাজের প্রতিটি ধাপে মান নিয়ন্ত্রণ, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জবাবদিহি এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। এখন দেখার বিষয়, প্রস্তাবিত উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের সড়ক নির্মাণ ও সংস্কার খাতে কতটা গুণগত পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়।

এফএইচ/বিএ/পিআর

সর্বোচ্চ পঠিত - Breaking News

আপনার জন্য নির্বাচিত