ঢাকা, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
১২ কার্তিক, ১৪৩৩

/ Breaking News

২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা, জেলেদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ

চাঁদপুর সংবাদদাতা

প্রকাশিত: ০৯:৩৬, ৭ অক্টোবর ২০২৬

২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা, জেলেদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ

ইলিশের প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় আজ বুধবার (৭ অক্টোবর) মধ্যরাত থেকে চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনাসহ দেশের নির্ধারিত নদ-নদীতে শুরু হচ্ছে ২২ দিনের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা। আগামী ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত নদীতে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ আহরণ, ক্রয়-বিক্রয়, মজুদ ও পরিবহন বন্ধ থাকবে। তবে নিষেধাজ্ঞার এই দীর্ঘ সময়ে মাছ ধরা বন্ধ থাকলেও সরকারি সহায়তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন চাঁদপুরের হাজারো জেলে।

চাঁদপুর জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৫১ হাজার ১৯০ জন। নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেদের জন্য সরকারি খাদ্য সহায়তার ব্যবস্থা থাকলেও ইতোমধ্যে ৫০ হাজার জেলের জন্য ২০ কেজি করে চাল বরাদ্দ এসেছে। অথচ সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রত্যেক জেলের জন্য ২৫ কেজি করে চাল দেওয়ার কথা। ফলে বরাদ্দ ও প্রাপ্যতার মধ্যে ঘাটতি থাকায় জেলেদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

এ ছাড়া নিবন্ধিত ৫১ হাজার ১৯০ জেলের মধ্যে ৫০ হাজার জেলের জন্য চাল বরাদ্দ এলেও অবশিষ্ট জেলেদের সহায়তা কীভাবে দেওয়া হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। মৎস্য বিভাগ জানিয়েছে, বাকি জেলেদের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

নিষেধাজ্ঞার কারণে ২২ দিন নদীতে যেতে পারবেন না জেলেরা। ফলে মাছ ধরা বন্ধ থাকায় আয়-রোজগারও বন্ধ থাকবে। এ অবস্থায় পরিবার-পরিজন নিয়ে কীভাবে চলবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন অনেক জেলে।

মতলব উত্তর উপজেলার আমিরাবাদ এলাকার জেলে হরি দাস বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞার সময়ে সরকার চাল সহায়তা দেয়। কিন্তু পরিবার নিয়ে চলতে এই সহায়তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। মাছ ধরতে না পারার কারণে আয় বন্ধ থাকে। তাই নিষেধাজ্ঞার সময় সহায়তা আরও বাড়ানো দরকার।’

চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনার বিস্তীর্ণ জলসীমা ইলিশের অন্যতম প্রধান বিচরণ ও প্রজননক্ষেত্র। জেলা মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল থেকে লক্ষ্মীপুর জেলার চর আলেকজেন্ডার পর্যন্ত প্রায় ১০০ কিলোমিটার নদী এলাকায় ইলিশের অভয়াশ্রম রয়েছে। এর মধ্যে চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল থেকে আমিরাবাদ পর্যন্ত প্রায় ৩০ কিলোমিটার নদী এলাকায় নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে বিশেষ নজরদারি থাকবে।

নিষেধাজ্ঞা সফল করতে জেলা প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ, নৌ পুলিশ, কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী ও উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে টাস্কফোর্স মাঠে থাকবে। নদীতে জেলেদের নামা ঠেকাতে নিয়মিত অভিযান, নৌ টহল, নৌযান তল্লাশি ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান বলেন, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কেউ মা ইলিশ শিকার করলে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট জেলেদের বিরুদ্ধে কারাদণ্ডের পাশাপাশি জেলে কার্ড বাতিলের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভয়াশ্রম এলাকায় নজরদারি বাড়াতে পাঁচটি অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

মতলব উত্তর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা স্বপন চন্দ্র দে বলেন, এ উপজেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৯ হাজার ৪ জন। নিষেধাজ্ঞার সময়ে সরকারিভাবে জেলেদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে। তবে এ সময়ে কাউকেই নদীতে নামতে দেওয়া হবে না।

তিনি জানান, নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করলে মৎস্য আইনে ১ থেকে ২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের ইলিশ গবেষক ড. মো. আনিসুর রহমান বলেন, ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে শুধু প্রশাসনিক অভিযান যথেষ্ট নয়। জাটকা ও মা ইলিশ রক্ষার পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেদের আর্থিক ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। জেলেদের জীবন-জীবিকা নিরাপদ না হলে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

মোহনপুর নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ রুহুল আমিন বলেন, মতলব উত্তরের প্রায় ৩০ কিলোমিটার নৌসীমার জেলেদের নিয়ে ইতোমধ্যে সচেতনতামূলক সভা করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি তাদের জানানো হয়েছে। এরপরও কেউ আইন অমান্য করে নদীতে নামলে মৎস্য আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মতলব উত্তর উপজেলা টাস্কফোর্স কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময়ে নদীতে নামলেই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইলিশ দেশের জাতীয় সম্পদ। এ সম্পদ রক্ষায় জনপ্রতিনিধি, জেলে ও স্থানীয় জনগণসহ সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

ইলিশের প্রজনন নিশ্চিত করতে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা গুরুত্বপূর্ণ হলেও জেলেদের জন্য পর্যাপ্ত সহায়তা নিশ্চিত না হলে এই সময়টি তাদের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তাই মা ইলিশ রক্ষার পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞার পুরো সময়ে জেলেদের খাদ্য ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জোরালো হচ্ছে।

এফএইচ/বিএ/পিআর

সর্বোচ্চ পঠিত - Breaking News

আপনার জন্য নির্বাচিত