৩৬ দিন পর সচল চুয়েট, তবু কাটেনি অচলাবস্থা—১২ বিভাগের ক্লাস ফিরল একটিতে
চুয়েট সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৮:২৭, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
টানা ৩৬ দিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে সীমিত পরিসরে অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমে ফিরেছেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) শিক্ষার্থীরা। বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকাল ৯টা থেকে নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগে কয়েকটি বর্ষের ক্লাস শুরু হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাকি ১১টি বিভাগে কোনো ক্লাস হয়নি।
শ্রেণিকক্ষে ফিরলেও সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের বক্তব্য, অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম চলবে, একই সঙ্গে দাবি আদায়ে আন্দোলনও অব্যাহত থাকবে।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান সংকট নিরসনে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠক করেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ছয় সদস্যের পরামর্শক কমিটি। বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য ও দাবিদাওয়া শুনে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সরকারকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে কমিটি।
কম উপস্থিতিতে একটি বিভাগে ক্লাস
বুধবার সকাল ৯টা থেকে নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগে ২১, ২২ ও ২৩ ব্যাচের ক্লাস অনুষ্ঠিত হয়। ক্লাস চলে বেলা ১১টা পর্যন্ত। তবে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল তুলনামূলক কম।
বিভাগটির চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ তালবী বলেন, স্বল্পসংখ্যক শিক্ষার্থী নিয়ে ক্লাস হয়েছে। রুটিন অনুযায়ী ল্যাব হওয়ার কথা থাকলেও বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সেটি স্থগিত করা হয়েছে।
বিভাগীয় প্রধান ফৌজিয়া গুলশানা রশিদ লোপা জানান, ২১, ২২ ও ২৩ ব্যাচের ক্লাস মোটামুটি অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে উপস্থিতি কম ছিল। বিশেষ করে ২১ ও ২২ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক বেশি উপস্থিত ছিলেন। আগামীকাল থেকে উপস্থিতি বাড়তে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে অনড় শিক্ষার্থীরা
ইউজিসির পরামর্শক কমিটির সঙ্গে বৈঠকে শিক্ষার্থীরা সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবি জানান। আন্দোলনের কারণ, চলমান সংকটের প্রেক্ষাপট এবং নিজেদের অবস্থানও কমিটির কাছে তুলে ধরেন তাঁরা।
যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী গোলাম মুর্শেদ রাতুল বলেন, শুরু থেকেই অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে তাঁরা অনড় রয়েছেন। শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও একই দাবিতে আন্দোলন করছেন। বৈঠকে তাঁদের অবস্থান কমিটির কাছে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বক্তব্য শুনল ইউজিসি কমিটি
বুধবার সকাল সাড়ে ১০টায় চুয়েটের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে শিক্ষকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের মধ্য দিয়ে ছয় সদস্যের পরামর্শক কমিটির কার্যক্রম শুরু হয়। পরে দুপুর ১২টার দিকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠক করেন কমিটির সদস্যরা।
শিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠক শেষে স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডিন অধ্যাপক রাশিদুল হাসান বলেন, চলমান পরিস্থিতি নিয়ে শিক্ষকদের বক্তব্য কমিটির কাছে তুলে ধরা হয়েছে। লিখিত নথিপত্র দেওয়ার পাশাপাশি মৌখিকভাবেও তাঁদের অবস্থান ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
তিনি জানান, আলোচনায় উঠে আসা বিষয়গুলো সরকারের উচ্চপর্যায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে জানানো হবে বলে তাঁরা আশা করছেন। এর মাধ্যমে অচলাবস্থা নিরসনে দ্রুত গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত আসবে বলে প্রত্যাশা তাঁদের।
মতামত জানাতে কমিটির সঙ্গে ছাত্রদলের নেতারা
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠকের পর পরামর্শক কমিটির সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেন চুয়েট ছাত্রদলের ছয় থেকে সাতজন নেতাকর্মী। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সংগঠনটির সভাপতি ওয়াসিফ রাশেদ ও সাংগঠনিক সম্পাদক বিপ্লব হোসাইন।
পরে সাংবাদিকদের ওয়াসিফ রাশেদ বলেন, দীর্ঘদিন ক্লাস বন্ধ থাকা এবং অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি তাঁরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। উপাচার্য নিয়োগ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত ও সার্বিক প্রক্রিয়ার অংশ উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁরা কোনো পক্ষের প্রতিপক্ষ হিসেবে আসেননি; বরং অচলাবস্থা নিরসনে নিজেদের মতামত জানাতে এসেছেন।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের অধিকার ও কল্যাণের বিষয়গুলো তাঁরা কমিটির কাছে তুলে ধরেছেন। উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করতে আসা কয়েকজনকে বাধা দেওয়া এবং বিভিন্ন অ্যাকাডেমিক গ্রুপ থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগও জানানো হয়েছে।
সরকারকে পরামর্শ দেবে কমিটি
ছয় সদস্যের পরামর্শক কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক আবদুল্লাহ-আল-মামুন। সদস্যসচিব ইউজিসির অতিরিক্ত পরিচালক মো. মহিবুল আহসান। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) উপাচার্য এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের বিশ্ববিদ্যালয় অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. মাহবুবুল হক পাটোয়ারী।
মতবিনিময় শেষে কমিটির প্রধান অধ্যাপক আবদুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, চুয়েটের চলমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সমাধানের পথ খুঁজতেই এ পরামর্শক কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রথম দিনে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বক্তব্য শোনা হয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গেও কথা বলা হবে।
সব পক্ষের বক্তব্য ও মতামত পর্যালোচনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকারকে পরামর্শ দেওয়ার চেষ্টা করবেন বলে জানান তিনি।
যেভাবে শুরু হয় অচলাবস্থা
গত ২১ সেপ্টেম্বর চুয়েটে নতুন উপাচার্য নিয়োগের পর থেকেই প্রতিবাদে নামেন শিক্ষার্থীরা। পরদিন থেকে শুরু হয় ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি। নিয়োগ বাতিলের দাবিতে ধারাবাহিক আন্দোলনের একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম, ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যায়।
দীর্ঘ ৩৬ দিনের অচলাবস্থার পর বুধবার নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের কয়েকটি বর্ষে ক্লাস শুরুর মধ্য দিয়ে সীমিত পরিসরে অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম ফিরেছে। তবে উপাচার্য পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি।
এফএইচ/বিএ/পিআর