ঢাকা, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
১২ কার্তিক, ১৪৩৩

/ Breaking News

আয়-ব্যয়ের ফারাকে নাজেহাল!দুর্দিনে ভুগছে ৬০ শতাংশ পরিবার

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০১:২৯, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

আয়-ব্যয়ের ফারাকে নাজেহাল!দুর্দিনে ভুগছে ৬০ শতাংশ পরিবার

আয় বাড়ছে না, অথচ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে বাসাভাড়া, যাতায়াত, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় বেড়েই চলেছে। সংসারের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে দেশের বিপুলসংখ্যক পরিবার। কারও ভরসা ঋণ, কেউ ভাঙছেন দীর্ঘদিনের সঞ্চয়। আবার অনেক পরিবার খাবারের তালিকা ছোট করছে, কমিয়ে দিচ্ছে মাছ-মাংস খাওয়াও। মূল্যস্ফীতি ও আয়-ব্যয়ের এই অসংগতিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বাড়ছে চাপ।

একটি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশে গত এক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে ঋণ করেছে ৪৭ দশমিক ৪২ শতাংশ পরিবার। গ্রামাঞ্চলে এ হার ৫১ দশমিক ৯১ শতাংশ, শহরাঞ্চলে ৪০ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং সিটি করপোরেশন এলাকায় ৩২ দশমিক ১১ শতাংশ।

পরিবারগুলোর গড় আয়-ব্যয়ের হিসাবেও ঘাটতির চিত্র উঠে এসেছে। তথ্য অনুযায়ী, দেশের একটি পরিবারের গড় মাসিক আয় ৩৩ হাজার ৫১৩ টাকা। বিপরীতে গড় মাসিক ব্যয় ৩৫ হাজার ৩১১ টাকা। অর্থাৎ, প্রতি মাসে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে গড়ে ঘাটতি থাকছে ১ হাজার ৭৯৮ টাকা।

গ্রাম-শহর কোথও স্বস্তি নেই

জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন সীমিত আয়ের মানুষ। গ্রামের পরিবারগুলোর মধ্যে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা শহরের তুলনায় বেশি। গ্রামীণ এলাকায় কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ তুলনামূলক সীমিত হওয়ায় অনেক পরিবারকে দৈনন্দিন খরচ চালাতে ধারদেনা করতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও সংসারের ব্যয় মেটাতে গরু-ছাগল বিক্রি করার মতো সিদ্ধান্তও নিতে হচ্ছে পরিবারগুলোকে।

অন্যদিকে শহরাঞ্চলের মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলোও বাড়িভাড়া, খাবার, যাতায়াত, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। অনেক পরিবার সঞ্চয় ভেঙে সংসার চালাচ্ছে। কারও কারও ক্ষেত্রে বাড়তি খরচ সামলাতে সন্তানদের টিউশনি কমানো কিংবা কম ভাড়ার বাসায় চলে যাওয়ার চিন্তা করতে হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, মহামারির পর থেকে অর্থনৈতিক দুর্বলতা, কর্মসংস্থানে স্থবিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও প্রকৃত মজুরির ওপর চাপ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। আয় ও ব্যয়ের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ব্যবধান তৈরি হওয়ায় পরিবারগুলোর আর্থিক নিরাপত্তাও দুর্বল হচ্ছে।

আয়-ব্যয়ের ব্যবধান বাড়াচ্ছে চাপ

প্রতিবেদনে উদ্ধৃত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মজুরি সূচক অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ৯ শতাংশ। আগের মাসে এ হার ছিল ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। অর্থাৎ মজুরি বৃদ্ধির গতিতে কিছুটা মন্থরতা দেখা গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টানা ৫৬ মাস মজুরি বৃদ্ধির হারের চেয়ে মূল্যস্ফীতির হার বেশি ছিল। এর ফলে শ্রমজীবী মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা চাপে পড়েছে।

পরিবারের গড় ব্যয়ের হিসাবেও অঞ্চলভেদে পার্থক্য রয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন এলাকায় একটি পরিবারের গড় মাসিক ব্যয় ৪৬ হাজার ৭৭৮ টাকা। শহরাঞ্চলে এ ব্যয় ৩৭ হাজার ৩৪৪ টাকা এবং গ্রামীণ এলাকায় ৩২ হাজার ৫৩২ টাকা।

এদিকে প্রতিবেদনে জাতীয় বেতন কমিশনের পরিচালিত ‘লিভিং স্ট্যান্ডার্ড সার্ভে’র তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, দেশে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে ২২ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের ঘাটতি ও জ্বালানি সংকটকে অর্থনৈতিক চাপের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে এ পূর্বাভাসের মূল প্রতিবেদন ও পদ্ধতিগত তথ্য আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

‘আয় কমছে, খরচ বাড়ছে’

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, যেকোনো পরিবারকে তাদের আর্থিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেই বোঝা যায়—আয় কমছে, অথচ খরচ বাড়ছে। ফলে অনেকের সামনে ঋণ নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকছে না।

তাঁর মতে, জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ার কারণে ব্যয় বাড়ছে না; বরং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিই ব্যয় বাড়ার প্রধান কারণ। গ্রামে কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ তুলনামূলক কম থাকায় সেখানকার পরিবারগুলো বেশি চাপে রয়েছে।

খাবারের তালিকা থেকেও বাদ পড়ছে মাছ-মাংস

নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকায় অনেক নিম্নআয়ের পরিবার খাবারের পরিমাণ ও মান কমাতে বাধ্য হচ্ছে। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত সরকারি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে ৯৬ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবার মাংস খাওয়া কমিয়েছে। মাছ খাওয়া কমিয়েছে ৮৮ দশমিক ২২ শতাংশ পরিবার। নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর ব্যয় গড়ে ১৩ শতাংশ বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে আয় বাড়েনি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, জরিপে ১৮ শতাংশ দরিদ্র মানুষের সারাদিন না খেয়ে থাকার তথ্য উঠে এসেছে। এমন পরিস্থিতি খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। তবে জরিপের নমুনা, সময়কাল ও প্রশ্নপদ্ধতি জানা না থাকায় এসব সংখ্যার ব্যাপ্তি বুঝতে মূল প্রতিবেদন দেখা জরুরি।

রাজধানীর কাজীপাড়া এলাকায় দুই সন্তান নিয়ে বসবাস করেন মিলি আক্তার। সংসারের ব্যয় সামলাতে গিয়ে তাঁকে একের পর এক খরচ কমাতে হচ্ছে।

মিলি বলেন, ‘গরু-খাসির মাংস অনেক আগেই কেনা বাদ দিয়েছি। এখন ডিম-দুধও খাওয়া যাচ্ছে না। গত মাসে ছেলের একটা টিউশনি কমিয়ে দিয়েছি। এভাবে আরও কয়েক মাস চললে যে বাসায় থাকছি, সেটাও ছাড়তে হবে। কম ভাড়ার বাসা খুঁজতে হবে।’

তিনি জানান, বাড়তি আয়ের জন্য তাঁর মেয়েও টিউশনি শুরু করেছে। তারপরও সংসারের খরচ মেটানো যাচ্ছে না। অসুস্থ হলে চিকিৎসার খরচ জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়ে। একবার অসুস্থ হওয়ার পর গ্রাম থেকে টাকা ধার করে চিকিৎসা করাতে হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে মাসিক খরচ ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা বেড়েছে।

সঞ্চয় ভেঙে চলছে সংসার

দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে শুধু ঋণ নয়, ব্যাংকে জমা রাখা অর্থও তুলে নিচ্ছেন অনেকে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ মাসিক প্রতিবেদনের বরাতে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর—এই আট মাসে দেশের ব্যাংকিং খাত থেকে নিট ৪৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা সঞ্চয় তুলে নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এ সময়ে ব্যাংকে জমা হওয়া অর্থের তুলনায় উত্তোলনের পরিমাণ বেশি ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম এম আকাশ এ পরিস্থিতিকে অর্থনীতির ভাষায় ‘ডিস-সেভিং’ বা ঋণাত্মক সঞ্চয় হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, মানুষ যখন ভবিষ্যতের জন্য জমানো টাকা দিয়ে বর্তমানের চাল-ডাল কেনে, তখন তা পরিবারের আর্থিক চাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।

সামগ্রিকভাবে আয়-ব্যয়ের ব্যবধান, ঋণনির্ভরতা, সঞ্চয় কমে যাওয়া এবং খাবারের ব্যয় সংকোচনের চিত্র সাধারণ পরিবারের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের ইঙ্গিত দেয়। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো, মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো এবং নিম্নআয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সুরক্ষার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এফএইচ/বিএ/পিআর

সর্বোচ্চ পঠিত - Breaking News

আপনার জন্য নির্বাচিত