ঢাকা, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
১২ কার্তিক, ১৪৩৩

/ Breaking News

ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে ধাক্কা, দাপট বাড়ছে চীন-ভিয়েতনামের

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৮:১২, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে ধাক্কা, দাপট বাড়ছে চীন-ভিয়েতনামের

ইউরোপের পোশাক বাজারে ক্রমেই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। একসময় শক্ত অবস্থানে থাকা দেশের তৈরি পোশাকশিল্প এখন চীন ও ভিয়েতনামের বাড়তি দাপটে চাপে পড়েছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আয় কমেছে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ। একই সময়ে চীন ও ভিয়েতনামের রপ্তানি বেড়েছে। ফলে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ রপ্তানি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের সংকলিত পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ইইউতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির মূল্য দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ইউরো। গত বছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ১৩ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ইউরো। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় কমেছে প্রায় ১ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ইউরো।

গত ২৪ অক্টোবর প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে আসা এই চিত্র বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের জন্য নতুন সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সামগ্রিক পোশাক আমদানি কমেছে ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে তার প্রায় তিন গুণ হারে। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, ইউরোপের বাজারে সামগ্রিক চাহিদা কমার পাশাপাশি প্রতিযোগীদের তুলনায় বাংলাদেশ বেশি চাপের মুখে রয়েছে।

বাজার হিস্যায়ও বড় ধাক্কা

ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির অংশীদারত্বও কমেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে ইইউর মোট পোশাক আমদানিতে বাংলাদেশের অংশ ছিল ২১ দশমিক ৫ শতাংশ। চলতি বছরের একই সময়ে তা নেমে এসেছে ১৯ দশমিক ৮ শতাংশে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বাজার হিস্যা কমেছে ১ দশমিক ৭ শতাংশ পয়েন্ট।

রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি পোশাক সরবরাহের পরিমাণ ও গড় মূল্যেও পতন দেখা গেছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে বাংলাদেশ থেকে ইইউতে পোশাক রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ। এ সময়ে রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৬৬ দশমিক ৭৬ মিলিয়ন কেজি।

একই সময়ে প্রতি কেজি পোশাকের গড় রপ্তানিমূল্য কমে হয়েছে ১৩ দশমিক ৭৬ ইউরো, যা আগের বছরের তুলনায় ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ কম। অর্থাৎ শুধু কম পোশাক রপ্তানি নয়, পণ্যের দাম কমে যাওয়াও আয় হ্রাসের অন্যতম কারণ।

চীনের দাপট, এগিয়ে ভিয়েতনামও

বাংলাদেশের বাজার হারানোর বিপরীতে ইউরোপে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করছে চীন। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ইইউতে চীনের পোশাক রপ্তানির মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ইউরো। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দেশটির রপ্তানি বেড়েছে ২ দশমিক ৩৮ শতাংশ।

ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট পোশাক আমদানিতে চীনের অংশ ৩০ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের বাজার হিস্যা যখন কমছে, তখন চীনের অংশীদারত্ব বাড়ছে।

ভিয়েতনামও পিছিয়ে নেই। দেশটির পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ইইউতে তাদের রপ্তানি প্রায় ৩ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে। বিপরীতে বাংলাদেশ ছাড়াও তুরস্ক, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়ার পোশাক রপ্তানি কমেছে।

কেন পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ?

পোশাক খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি কমার পেছনে আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি ও দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা—দুই-ই ভূমিকা রাখছে।

প্রথমত, ইউরোপে ভোক্তা চাহিদার দুর্বলতা রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অনেক ভোক্তা পোশাক কেনায় ব্যয় কমাচ্ছেন। এতে আমদানিকারকেরা নতুন ক্রয়াদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক হয়ে উঠেছেন।

দ্বিতীয়ত, চীনের মূল্য প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কসংক্রান্ত চাপের মধ্যে চীনা রপ্তানিকারকেরা ইউরোপে বিক্রি বাড়ানোর দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। তুলনামূলক কম দামে পণ্য সরবরাহ করে নতুন ক্রয়াদেশ পাওয়ার প্রতিযোগিতায়ও তারা এগিয়ে থাকার চেষ্টা করছেন।

তৃতীয়ত, বাংলাদেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যা, উৎপাদন ব্যয় এবং পণ্য পরিবহনে দীর্ঘ সময় লাগার মতো বিষয় রপ্তানিকারকদের সক্ষমতায় প্রভাব ফেলছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা কম দামে দ্রুত পণ্য সরবরাহ চান। এ ক্ষেত্রে সময় ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।

এ ছাড়া কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাকের বাজারেও বাংলাদেশের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পলিয়েস্টারসহ কৃত্রিম তন্তুর পোশাক উৎপাদন ও দ্রুত সরবরাহে ভিয়েতনাম তুলনামূলক সুবিধা পাচ্ছে। বাংলাদেশকে এসব কাঁচামালের উল্লেখযোগ্য অংশ আমদানি করতে হয়। ফলে অল্প সময়ে ছোট আকারের ক্রয়াদেশ পূরণে দেশীয় উৎপাদকদের বাড়তি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে।

প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোই বড় চ্যালেঞ্জ

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখতে হলে শুধু উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ালেই চলবে না। পণ্যের বৈচিত্র্য, কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাক উৎপাদন, কাঁচামালের সহজলভ্যতা, জ্বালানি সরবরাহ এবং দ্রুত পণ্য সরবরাহের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

এ বিষয়ে বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ক্রেতাদের কম দামে পোশাক কেনার চাপ সব রপ্তানিকারক দেশের ওপরই রয়েছে। ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া ছাড়া অধিকাংশ দেশের পোশাকের ইউনিট প্রাইস কমেছে। চীনের আগ্রাসী বিপণন কৌশলের কারণে দেশটি বাজার পুনরুদ্ধারের সুযোগ বেশি কাজে লাগাচ্ছে।

তিনি বলেন, সামনে বাংলাদেশের রপ্তানিমূল্য ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা অনেকটাই জ্বালানির দামের ওপর নির্ভর করবে।

সব মিলিয়ে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমে যাওয়া শুধু সাময়িক আয়হ্রাসের বিষয় নয়; এটি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় দেশের অবস্থান নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলছে। চীন ও ভিয়েতনাম যখন বাজার সম্প্রসারণে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, পণ্যে বৈচিত্র্য আনা এবং ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

এফএইচ/বিএ/পিআর

সর্বোচ্চ পঠিত - Breaking News

আপনার জন্য নির্বাচিত