জমি দখল থেকে ভবন নির্মাণ, নাজিমুদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগের দীর্ঘ তালিকা
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০১:৪৯, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রাজধানীর মিরপুরের ইসিবি চত্বর এলাকায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুরের ঘটনায় আলোচনায় এসেছেন আবাসন ব্যবসায়ী মো. নাজিমুদ্দিন ভূঁইয়া ওরফে আরজু। নিউগিনি প্রোপার্টিজের মালিক নাজিমুদ্দিনের বিরুদ্ধে জমি দখল, অনুমোদন ছাড়া ভবন নির্মাণ, সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর হামলাসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ নিয়ে এর আগে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল দৈনিক কালবেলা।
গত শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) রাতে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। স্টুডিওটি নাজিমুদ্দিনের কাছ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বর্গফুট জায়গা ভাড়া নিয়ে তৈরি করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন। পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য অনুযায়ী, জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের জেরেই এ ঘটনা ঘটেছে। সালমানের স্টুডিওকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে পুলিশ বলেছে, হামলার মূল লক্ষ্য স্টুডিও ছিল বলে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে না।
স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, নাজিমুদ্দিন সম্প্রতি ওই এলাকায় তিনটি নতুন গেট নির্মাণ করেন। গেটগুলো এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছে, যাতে অন্য জমির মালিকেরা তাঁদের জমিতে যেতে না পারেন। এ নিয়ে কয়েকজন সাবেক সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়। পরে গেট ভাঙতে গিয়ে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।
কালবেলার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, নাজিমুদ্দিনের গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে। জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর জন্ম ১৯৮৯ সালের ডিসেম্বরে। ২০১০ সালের দিকে তিনি ঢাকায় আসেন। প্রথম দিকে রামপুরার একটি মাদ্রাসায় পড়াশোনার পাশাপাশি ভাসানটেক এলাকায় ভাঙাড়ি ও থাই গ্লাসের ব্যবসা করতেন। পরে আবাসন ব্যবসায় যুক্ত হয়ে নিউগিনি প্রোপার্টিজ লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করেন।
স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, ক্যান্টনমেন্ট থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হাজি আব্বাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে তিনি জমি দখলের কার্যক্রম শুরু করেন। একপর্যায়ে এলাকায় আবাসন ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিতি পেলেও জমি দখলের অভিযোগে স্থানীয়দের একাংশের সমালোচনার মুখে পড়েন।
তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, তিনি জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে নিজেকে গুলশান আজাদ ইউনিট আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে ২০২৫ সালের ১৪ নভেম্বর গুলশান আজাদ ইউনিট আওয়ামী লীগের সভাপতি হাজি মো. সাহিবুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক মো. আরিদুল ইসলাম এক বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করেন, নাজিমুদ্দিন ওই ইউনিটের কমিটির কেউ নন।
কালবেলার অনুসন্ধানে জোয়ারসাহারা মৌজায় প্রায় ১৪ বিঘা জমি দখলে রাখার অভিযোগ উঠে আসে নাজিমুদ্দিনের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁর দখলের কারণে অনেক জমির মালিক তাঁদের বসতভিটা ও জমি ব্যবহার করতে পারছেন না। কয়েকজন সাবেক সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তার জমি দখলের অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগের তালিকায় বোরহান উদ্দিনের ৩ দশমিক ৩৭ কাঠা, শরফত মোল্লার ৩১ দশমিক ৮২ কাঠা, মইদুর আলীর ওয়ারিশ হালিমা খাতুনের ৩ কাঠা, ইকবাল হোসেন গংদের আমমোক্তারনামা মালিক আক্তারুজ্জামানের ১৫ দশমিক ৭৬ কাঠা এবং শামিমা ইসলাম গংয়ের ১৪ দশমিক ০৬ কাঠা জমির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া সাজেদুর রহমান, সাকুরা সাবের, মোশারফ হোসেন, ফখরুল ইসলাম, শিউলি আক্তার, হারুন রশীদসহ আরও কয়েকজনের জমি দখলে রাখার অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট জমির মালিকদের বক্তব্য ও আদালতের নথি দিয়ে প্রতিটি দাবি আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
রাজউকের কর্মকর্তাদের ওপর হামলার অভিযোগ
নিউগিনি প্রোপার্টিজের নামে রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানার জোয়ারসাহারা মৌজার মানিকদী এলাকায় রাজউকের অনুমোদন ছাড়া ভবন নির্মাণের অভিযোগও রয়েছে নাজিমুদ্দিনের বিরুদ্ধে।
অভিযোগের পর রাজউকের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে সেখানে অভিযান চালানো হয়। ওই সময় নির্মাণকাজ বন্ধের নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি ভবনটির বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। অভিযানের সময় নাজিমুদ্দিন ও তাঁর লোকজন রাজউকের কর্মকর্তাদের ওপর হামলা চালান বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় রাজউকের ইমারত পরিদর্শক শেখ আতিফ হোসেন ইমন ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করেন।
বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার দাবি
কালবেলার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে নাজিমুদ্দিনের নামে ও তাঁর সংশ্লিষ্টতায় বিপুল সম্পদের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে জোয়ারসাহারা মৌজায় প্রায় ১৭ বিঘা এবং বাউনিয়া মৌজায় প্রায় ১০ বিঘা জমির কথা উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া মিরপুর ডিওএইচএসে দুটি ফ্ল্যাট, মিরপুরে সিটি কাবাবের নামে জমি, লাল মিয়ার টেকে বহুতল ভবন এবং বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একাধিক প্লট ও ফ্ল্যাট থাকার তথ্য প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, লক্ষ্মীপুরের গ্রামের বাড়িতে তাঁর প্রায় ৮০ বিঘা জমি রয়েছে। পাশাপাশি দুবাই ও মালয়েশিয়ায় ব্যবসায়িক বিনিয়োগের তথ্যও উঠে আসে। এসব সম্পদের সম্মিলিত মূল্য কয়েক শ কোটি টাকা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সম্পদের মালিকানা ও মূল্য সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি দিয়ে স্বাধীনভাবে যাচাইয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
অভিযোগ অস্বীকার নাজিমুদ্দিনের
তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নাজিমুদ্দিন ভূঁইয়া। কালবেলাকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, কারও জমি দখল করেননি এবং তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। রাজউকের কর্মকর্তাদের ওপর হামলার অভিযোগও নাকচ করেন তিনি। নিজের সম্পদ সম্পর্কে তাঁর দাবি, তিন কাঠা জমির ওপর একটি টিনশেড বাড়ি ছাড়া তাঁর আর কোনো সম্পদ নেই। ব্যবসা হালাল উপায়ে করেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুরের ঘটনায় জমি নিয়ে বিরোধের বিষয়টি সামনে আসার পর নাজিমুদ্দিনকে ঘিরে আগের অভিযোগগুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট তদন্ত, মামলা ও আদালতের নথিই চূড়ান্ত বিবেচ্য।
এফএইচ/বিএ/পিআর