শেকৃবির গবেষণা মাঠে সচিবালয় নির্মাণের প্রস্তুতি, সয়েল টেস্ট বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের ৩ দিনের আলটিমেটাম
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০১:২৭, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) দাবি করা গবেষণা মাঠে সচিবালয় নির্মাণের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে চলমান মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা (সয়েল টেস্ট) বন্ধ করে দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। মাঠ পুনরুদ্ধারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে তিন দিনের আলটিমেটাম দিয়ে জরুরি সিন্ডিকেট সভা আহ্বান এবং আইনি লড়াই শুরুর দাবি জানিয়েছেন তারা। দাবি পূরণ না হলে আরও কঠোর আন্দোলন, এমনকি আমরণ অনশনে যাওয়ারও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা গণজমায়েত ও বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে পুরোনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার মাঠে যান। সেখানে অবস্থান নিয়ে সয়েল টেস্টের কাজ বন্ধ করে দেন তারা। এ সময় পরীক্ষার সরঞ্জাম ও নমুনা সংগ্রহের কাজে ব্যবহৃত দুটি গাড়ি ক্যাম্পাসে নিয়ে আসেন শিক্ষার্থীরা। মাঠে গণপূর্ত অধিদপ্তরের লাগানো একটি সাইনবোর্ডও সরিয়ে এনে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে রাখা হয়।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ও কৃষি গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই মাঠ অন্য কাজে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা রক্ষায় প্রশাসনের দৃশ্যমান কার্যকর পদক্ষেপ নেই। দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করেও দাবি পূরণ না হওয়ায় তারা কঠোর অবস্থান নিতে বাধ্য হয়েছেন।
তিন দিনের সময়সীমা, রিটের সিদ্ধান্ত চান শিক্ষার্থীরা
মাঠে সয়েল টেস্টের কাজ বন্ধ করার পর শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল লতিফের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. বেলাল হোসেন, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক আবুল বাশার এবং প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
সাক্ষাৎকালে আন্দোলনকারীরা তিন দিনের মধ্যে জরুরি সিন্ডিকেট সভা ডেকে গবেষণা মাঠ পুনরুদ্ধারে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণার দাবি জানান। একই সঙ্গে সচিবালয় স্থানান্তর-সংক্রান্ত উদ্যোগের বিরুদ্ধে রিট করার বিষয়ে দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত চেয়েছেন তারা।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থী মো. আশিক আহমদ বলেন, ‘আজ আমরা মাঠে চলমান সয়েল টেস্টের স্যাম্পল নিয়ে ক্যাম্পাসে চলে এসেছি। প্রশাসনকে তিন দিনের সময় দিচ্ছি। এর মধ্যে সিন্ডিকেট সভা ডেকে জোরালো আইনি লড়াইয়ের ঘোষণা দিতে হবে এবং ওই জায়গা যে আমাদের, তা প্রশাসনকে নিশ্চিত করতে হবে।’
শিক্ষার্থীরা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি করা জমি পুনরুদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।
ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন, বুধবার লাল কাপড় বেঁধে অবস্থান
গবেষণা মাঠ পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী ওয়াসিউল হাসান সরকার জানান, মাঠ রক্ষার দাবিতে সংহতি জানিয়ে শিক্ষার্থীরা স্নাতকোত্তরের সব ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন করেছেন।
তবে পরীক্ষা স্থগিতের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা মাঠ পুনরুদ্ধার-সংক্রান্ত স্টিয়ারিং কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক এম. সালাহউদ্দিন মাহমুদ চৌধুরী বলেন, পরীক্ষার তারিখ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত সাধারণত সংশ্লিষ্ট বিভাগের চেয়ারম্যানদের সভায় নেওয়া হয়। আপাতত পূর্বনির্ধারিত তারিখ অনুযায়ী পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। পরে পরিস্থিতি বিবেচনায় পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি হিসেবে বুধবার (২৮ অক্টোবর) মাথায় লাল কাপড় বেঁধে গণজমায়েত ও অবস্থান কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
প্রশাসনের বক্তব্য: কমিটির সিদ্ধান্তের অপেক্ষা
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল লতিফ বলেন, বাণিজ্যমেলার মাঠ-সংক্রান্ত একটি কমিটি রয়েছে। রিট করার বিষয়ে কমিটি এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। কমিটির সিদ্ধান্ত পাওয়া গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন উপদেষ্টার সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, কমিটির সঙ্গে দ্রুত আলোচনা করে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ শুরু করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে মাঠ পুনরুদ্ধার-সংক্রান্ত কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক এম. সালাহউদ্দিন মাহমুদ চৌধুরীর বক্তব্য, কমিটির সিদ্ধান্ত বারবার জানানো হলেও সে অনুযায়ী কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। প্রশাসনের সঙ্গে এ বিষয়ে মতপার্থক্য থাকায় আন্দোলনকারীদের ক্ষোভ আরও বেড়েছে।
মেলা কর্তৃপক্ষের দাবি, ৮০ শতাংশ কাজ শেষ
অন্যদিকে, মেলা-সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, গণপূর্ত অধিদপ্তরের অনুমতি নিয়েই সেখানে কাজ চলছে। তাঁর ভাষ্য, মেলার প্রস্তুতিমূলক কাজের প্রায় ৮০ শতাংশ শেষ হয়েছে। শিক্ষার্থীদের দাবি গুরুত্বপূর্ণ হলেও জমি ও এর ব্যবহার নিয়ে বিরোধের সমাধান দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়।
তবে মেলা-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার এই বক্তব্যের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি। জমিটির মালিকানা, বরাদ্দ এবং ব্যবহারের অধিকার নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক নথি ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
আগেও সচিবালয় স্থানান্তরের উদ্যোগ, দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন
শেকৃবির দাবি করা এই মাঠ নিয়ে বিরোধ নতুন নয়। ২০১৫ সালেও সেখানে সচিবালয় স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হলে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি ‘টেক ব্যাক শেকৃবি ল্যান্ড’ কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা মাঠ পুনরুদ্ধারের দাবিতে সমাবেশ করেন। সর্বশেষ গত ১৫ অক্টোবর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেন বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সদস্যরা। একই দিন মাঠ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে স্মারকলিপিও দেওয়া হয়।
আন্দোলনকারীদের দাবি, গবেষণা মাঠটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবহারিক শিক্ষা, কৃষিবিষয়ক গবেষণা ও ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সেখানে অন্য স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ বন্ধ করে জমিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে।
এখন শিক্ষার্থীদের দেওয়া তিন দিনের সময়সীমার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কী পদক্ষেপ নেয়, সেটিই আন্দোলনের পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এফএইচ/বিএ/পিআর