মাওকে নিয়ে মন্তব্যে তোলপাড় চীন, ক্ষমা চেয়েও বিপাকে এমবাপ্পে
ক্রীড়া ডেস্ক
প্রকাশিত: ০১:০৪, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
চীনের সাবেক নেতা মাও সে তুংকে নিয়ে মন্তব্যের জেরে তীব্র বিতর্কে জড়িয়েছেন ফরাসি ফুটবল তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে। বিতর্কের মুখে ক্ষমা চেয়েছেন রিয়াল মাদ্রিদের এই ফরোয়ার্ড। তার ক্ষমা প্রার্থনাকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার কথা জানিয়েছে বেইজিং। তবে এতেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। চীনে স্প্যানিশ লিগের সম্প্রচার স্থগিত, একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিধিনিষেধের মুখে পড়েছেন তিনি।
বুধবার নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, এমবাপ্পের ক্ষমা প্রার্থনাকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে বেইজিং।
ফরাসি অনুষ্ঠান ‘দ্য ব্রিজ’-এ দেওয়া এমবাপ্পের একটি সাক্ষাৎকারের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিতর্কের সূত্রপাত। সেখানে ইন্টারনেটে দেখা একটি মজার মিম নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ডিজিটাল প্রযুক্তির সাহায্যে অন্য একজনের ছবিতে তার মুখ বসানো হয়েছিল। ওই ব্যক্তিকে চীনের কোনো স্বৈরশাসক বলে উল্লেখ করেন তিনি। যদিও ভিডিওতে সরাসরি মাও সে তুংয়ের নাম বলেননি এমবাপ্পে।
ধারণা করা হচ্ছে, তিনি মাওয়ের ছবিতে নিজের মুখ বসানো একটি মিমের কথা বলছিলেন। চীনে মাওকে নিয়ে রসিকতা অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। ১৯৭৬ সালে মারা যাওয়া এই নেতা আধুনিক চীনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত। তবে তার শাসনামলের বিভিন্ন নীতির কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যুর ঘটনাও ইতিহাসে আলোচিত।
সমালোচনার মুখে মঙ্গলবার ফরাসি, চীনা ও ইংরেজি ভাষায় বিবৃতি দিয়ে ক্ষমা চান এমবাপ্পে। তিনি স্বীকার করেন, তার মন্তব্যটি বিবেচনাপ্রসূত ছিল না এবং এতে চীন ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা চীনা সম্প্রদায়ের মানুষ কষ্ট পেয়ে থাকতে পারেন। যারা তার কথায় আঘাত পেয়েছেন, তাদের সবার কাছে ক্ষমা চান তিনি। পরে সাক্ষাৎকারের বিতর্কিত ভিডিওটি সরিয়ে নেওয়া হয়।
চীনে লা লিগার সম্প্রচার স্থগিত
ক্ষমা চাইলেও এমবাপ্পেকে ঘিরে বিতর্কের প্রভাব পড়েছে চীনের ক্রীড়াঙ্গন ও সম্প্রচারমাধ্যমে। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির তত্ত্বাবধানকারী সংস্থা চায়না মিডিয়া গ্রুপ (সিএমজি) স্প্যানিশ ফুটবল লিগ লা লিগার ম্যাচ সম্প্রচার স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এদিকে এমবাপ্পের মন্তব্যে চীনা সমর্থকেরা কষ্ট পেয়ে থাকলে তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে লা লিগা কর্তৃপক্ষ। তবে এই দুঃখ প্রকাশের পরও সম্প্রচার স্থগিতের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন
চীনে বাণিজ্যিকভাবেও চাপের মুখে পড়েছেন ২৭ বছর বয়সী এমবাপ্পে। দেশটির পানীয় প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ডংপেং তার সঙ্গে সব ধরনের সহযোগিতা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। একই পথে হেঁটেছে দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান মেংনিউ ও মিল্কগ্রাউন্ড।
বিশ্বকাপ চলাকালে চীনে ডংপেংয়ের বিজ্ঞাপনে নিয়মিত দেখা গেছে এমবাপ্পেকে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি বিজ্ঞাপনগুলোতে তাকে প্রতিষ্ঠানটির পানীয় পান করতে দেখা যেত।
এ ছাড়া চীনের কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের দাবি, বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড দিওর ও হাবলোও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ওয়েইবো থেকে এমবাপ্পেকে নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রচারমূলক কনটেন্ট সরিয়ে ফেলেছে। বার্তা সংস্থা এএফপি প্রতিষ্ঠান দুটির ওয়েইবো অ্যাকাউন্টে তার চীনা নাম দিয়ে অনুসন্ধান করেও কোনো ফল পায়নি।
সামাজিক মাধ্যমেও বিধিনিষেধ
চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতেও সমালোচনার মুখে পড়েছেন এমবাপ্পে। ওয়েইবোতে তার মন্তব্য নিয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ব্যবহারকারীরা। কিছু মন্তব্যে ব্যক্তিগত ও বর্ণবাদী আক্রমণও দেখা গেছে।
এদিকে চীনের জনপ্রিয় সামাজিক মাধ্যম শিয়াওহংশুতে এমবাপ্পের অ্যাকাউন্টে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। সেখানে তার অনুসারীর সংখ্যা ১০ লাখের বেশি। ওয়েইবোতেও নতুন করে তার অ্যাকাউন্ট অনুসরণ করার সুযোগ বন্ধ রাখা হয়েছে। প্ল্যাটফর্মের নোটিশে আইন অথবা নীতিমালা লঙ্ঘনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
চীনের বাজারেও বিতর্কের প্রভাবের ইঙ্গিত মিলেছে। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেইজিংয়ের সানলিতুন শপিং এলাকায় অ্যাডিডাসের একটি বড় বিক্রয়কেন্দ্রে রিয়াল মাদ্রিদের জার্সি পাওয়া গেলেও এমবাপ্পের নাম লেখা জার্সি পাওয়া যায়নি। অবশ্য দেশটির অনলাইন কেনাকাটার প্ল্যাটফর্ম তাওবাওতে তার নাম ও ছবি ব্যবহার করা বিভিন্ন পণ্য এখনও পাওয়া যাচ্ছে।
চীনে তারকাদের বিতর্ক নতুন নয়
চীনে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াতারকাদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়ে মন্তব্য ঘিরে বিতর্কের নজির আগেও রয়েছে। ২০১৯ সালে হংকংয়ের বিক্ষোভকারীদের সমর্থনে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দিয়ে বিতর্কে জড়ান এনবিএ দল হিউস্টন রকেটসের তৎকালীন কর্মকর্তা ড্যারিল মোরি। এর পর চীনে এনবিএর সঙ্গে বিভিন্ন পৃষ্ঠপোষকতা চুক্তি স্থগিত করা হয় এবং রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এক বছরের জন্য লিগটির ম্যাচ সম্প্রচার বন্ধ রাখা হয়।
এমবাপ্পেকে ঘিরে চলমান বিতর্কের মধ্যে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম পিপলস ডেইলি বিদেশি তারকাদের অন্য দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সামাজিক রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার আহ্বান জানিয়েছে। পত্রিকাটির এক মতামতধর্মী নিবন্ধে বলা হয়, বিশ্বায়নের যুগে আন্তর্জাতিক তারকারা বিভিন্ন দেশের সমর্থক ও ব্যবসায়িক অংশীদারদের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। তাই ভিন্ন সংস্কৃতি ও জাতীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখানো জরুরি।
চীন এমবাপ্পের ক্ষমা প্রার্থনাকে গুরুত্ব দিয়েছে বলে জানালেও তার ওপর আরোপিত সামাজিক মাধ্যমের বিধিনিষেধ, সম্প্রচার স্থগিতের সিদ্ধান্ত এবং বাণিজ্যিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত। ফলে ক্ষমা চাওয়ার পরও বিতর্কের জের কাটেনি ফরাসি এই ফুটবল তারকার।
এফএইচ/বিএ/পিআর